‘আলমা’ নামের জাহাজে ইসরায়েলি আক্রমণ। ছবিঃ ফ্লোটিলা লাইভ ট্রাকার ওয়েবসাইট থেকে
মেলবোর্ন, ২ অক্টোবর- ফিলিস্তিনের গাজামুখী ত্রাণবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র ‘আলমা’ নামের জাহাজে ইসরায়েলি বাহিনী আক্রমণ চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম। বুধবার (১ অক্টোবর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, “আমরা এখন ‘কনশানস’ জাহাজে আছি। কিছুক্ষণ আগে খবর এসেছে, ‘আলমা’-র ওপর আক্রমণ হয়েছে। আমরা সবাই এখানে জড়ো হয়েছি এবং পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট করার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আলমা ছিল বহরের একেবারে সামনে, আর আমরা পেছনের দিকে। তাই সেখানে যা ঘটছে, তা আমাদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।”

যেখানে আলমা হামলার শিকার হয়েছে। ছবিঃ ফ্লোটিলা লাইভ ট্রাকার ওয়েবসাইট থেকে
‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ হলো একটি আন্তর্জাতিক মানবিক নৌবহর, যার লক্ষ্য অবরুদ্ধ গাজায় সরাসরি সমুদ্রপথে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া। প্রায় ৪০টি ছোট নৌযান নিয়ে গঠিত এই বহরে আছেন ৪৪টি দেশের প্রায় ৫০০ মানবাধিকারকর্মী, রাজনীতিক, সাংবাদিক ও চিকিৎসক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য, সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনের কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি ম্যান্ডলা ম্যান্ডেলা।

ফ্লোটিলা যত গাজার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, পরিস্থিতি ততই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে শহিদুল আলম ইতালির একটি বন্দর থেকে প্রধান নৌযান ‘কনশানস’-এ ওঠেন। যাত্রার শুরুতে তিনি বলেছিলেন, “আমরা মানবিক বার্তা নিয়ে যাচ্ছি, অস্ত্র নয়।”
ফ্লোটিলার প্রধান নৌযান ‘কনশানস’-এর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই বর্তমানে ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজগুলো অবস্থান করছে। ফ্লোটিলার স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ইয়াসেমিন আকর আল–জাজিরাকে জানিয়েছেন, “ইসরায়েলি নৌযান দুই দিক থেকে ‘আলমা’কে ঘিরে ফেলেছে। যে কোনো মুহূর্তে তারা জাহাজে হস্তক্ষেপ করতে পারে।”
ইসরায়েলের প্রকাশ্য হুমকি উপেক্ষা করেই গাজার দিকে এগোচ্ছে এই নৌবহর। তবে বুধবার রাতে ফ্লোটিলার কয়েকটি নৌযান সাইবার হামলার শিকার হয়, যার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছু সময়ের জন্য ভেঙে পড়ে। একই রাতে ইসরায়েলি দুটি যুদ্ধজাহাজ দ্রুতগতিতে এসে ‘আলমা’ ও ‘সাইরাস’ নামের জাহাজ দুটি ঘিরে ফেলে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার এক্সে (পূর্বে টুইটার) লিখেছেন, “এখনও সময় আছে। চাইলে ত্রাণসামগ্রী সাইপ্রাস, আশকেলন মেরিনা বা অন্য বন্দরে হস্তান্তর করতে পারেন।” এর জবাবে ফ্লোটিলা কমিটি জানায়, “ইসরায়েলের এই আচরণ ৪০টিরও বেশি দেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। আমরা গাজার দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখব।”
ইতালি ও স্পেন জানিয়েছে, উদ্ধার ও মানবিক সহায়তার জন্য তাদের নৌবাহিনী প্রস্তুত আছে, যদিও তারা কোনো সামরিক পদক্ষেপে অংশ নেবে না। তুরস্কও ড্রোনের মাধ্যমে পুরো অভিযানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, “বিশ্বের সব রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই ফ্লোটিলার নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা। ইসরায়েলের অবরোধ ও হামলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো প্রয়োজন।”
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ২০ জন সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে চিঠি দিয়ে ফ্লোটিলার নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ, রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমরসহ কয়েকজন প্রগতিশীল আইনপ্রণেতা।
২০০৭ সালে হামাস গাজায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইসরায়েল সমুদ্রপথে অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের যুদ্ধের পর থেকে অবরোধ আরও কঠোর হয়। মার্চের পর থেকে গাজায় কার্যত সব ধরনের ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বৃহস্পতিবার সকাল নাগাদ ইসরায়েলি বাহিনী ‘সুমুদ ফ্লোটিলা’র নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। বহর যত গাজার উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ভূমধ্যসাগরের উত্তেজনাও তত বেড়ে যাচ্ছে। এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে—ইসরায়েল কি আবারও মানবিক সহায়তার পথ রক্তাক্ত করবে?
সুত্রঃ আল জাজিরা ও শহিদুল আলমের ফেসবুক একাউন্ট