এক ব্যক্তি গাড়ি চালিয়ে উপস্থিত জনতার ভেতর ঢুকে পড়ে এবং পরে ছুরি নিয়ে হামলা চালায়। ছবিঃ এপি
মেলবোর্ন, ৩ অক্টোবর- যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে একটি সিনাগগের বাইরে ভয়াবহ হামলায় দুইজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন।ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে পবিত্র দিন ‘ইয়ম কিপুর’-এর দিনে সংঘটিত এই ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে ঘোষণা করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হিটন পার্ক হিব্রু কংগ্রিগেশন সিনাগগের সামনে ঘটনাটি ঘটে। এক ব্যক্তি গাড়ি চালিয়ে উপস্থিত জনতার ভেতর ঢুকে পড়ে এবং পরে ছুরি নিয়ে হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীর গায়ে বিস্ফোরক ভেস্ট সদৃশ কিছু ছিল। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করে।
গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ জানায়, জরুরি ফোন পাওয়ার মাত্র সাত মিনিটের মধ্যেই হামলাকারীকে গুলি করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি শরীরে এমন একটি ভেস্ট পরেছিলেন যা দেখতে বিস্ফোরক ডিভাইসের মতো ছিল। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন পুলিশ কর্মকর্তা চিৎকার করে বলছেন, “তার কাছে বোমা আছে, সরে যান!”, এরপরই গুলির শব্দ শোনা যায়।
বিবিসির সম্প্রচারিত দৃশ্যে দেখা গেছে, সিনাগগের দেয়ালের নিচে নীল তারকা-অফ-ডেভিড চিহ্নের পাশে এক ব্যক্তিকে মাটিতে পড়ে থাকতে, তার দিকে পুলিশ বন্দুক তাক করে আছে। এক পর্যায়ে যখন ওই ব্যক্তি উঠতে চেষ্টা করেন, তখন গুলির শব্দ শোনা যায়।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার ঘটনাটিকে “নৃশংস” বলে অভিহিত করে বলেছেন, “এই হামলাকারী ইহুদিদের ওপর হামলা করেছে শুধুমাত্র তারা ইহুদি বলে।” তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেবে এবং এলাকায় আরও দৃশ্যমান পুলিশ মোতায়েন করা হবে।
রাজা চার্লস ও রানি কামিলাও এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, “এই ভয়াবহ হামলার খবর পেয়ে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। আমাদের চিন্তা ও প্রার্থনা রইল ক্ষতিগ্রস্ত সবার জন্য।” একইভাবে প্রিন্স ও প্রিন্সেস অব ওয়েলসও সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দিয়ে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কাউন্টার টেররিজম ইউনিট হামলার তদন্ত শুরু করেছে। ইউনিটের প্রধান সহকারী কমিশনার লরেন্স টেলর বলেন, “আজকের হামলায় নিহত ও আহতদের কথা আমরা সবার আগে ভাবছি। ইয়ম কিপুরের দিনে আমাদের ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর এই হামলা সত্যিই মর্মান্তিক।”
স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা থেকে পুরো এলাকায় ইন্টারনেট সীমিত করা হয়েছে এবং আশপাশের সব সিনাগগে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এলাকাটি ঘিরে রাখা হয় এবং ভেতরে অবস্থানরত শতাধিক উপাসককে নিরাপদে সরিয়ে নেয় পুলিশ।
এক প্রত্যক্ষদর্শী চাভা লেভিন জানান, তিনি প্রথমে একটি শব্দ শুনে ভেবেছিলেন আতশবাজি ফেটেছে। পরে তার স্বামী এসে বলেন, “এটা সন্ত্রাসী হামলা।” আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, হামলাকারীর গাড়িটি সিনাগগের ফটকে ধাক্কা মেরে থামে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে ছুরি নিয়ে হামলা শুরু করে।
এই ঘটনার পর পুলিশ “প্লেটো” নামে জরুরি কোড জারি করে, যা যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী হামলার সময় ব্যবহৃত হয়। প্রধানমন্ত্রী স্টার্মার কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় সম্মেলন থেকে তাৎক্ষণিকভাবে লন্ডনে ফিরে আসেন এবং সরকারের জরুরি কমিটি “কোবরা” বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
স্টার্মার বলেন, “ইয়ম কিপুরের দিনে এই হামলা আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের প্রতি আমি গভীর সমবেদনা জানাই, এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জরুরি সেবাদানকারী সব সংস্থাকে ধন্যবাদ জানাই।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে ইহুদি-বিরোধী ঘটনাবলি বেড়ে গেছে। কমিউনিটি সিকিউরিটি ট্রাস্ট (CST) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর থেকে দেশে অ্যান্টিসেমিটিক ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেড় হাজারেরও বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা গত বছরের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ম্যানচেস্টার ২০১৭ সালে ব্রিটেনের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ হামলার সাক্ষী ছিল, যখন একটি সংগীতানুষ্ঠানে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২২ জন নিহত হয়। নতুন এই হামলার ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে আবারও আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সুত্রঃ নাইন নিউজ ও এপি