মেলবোর্ন,৫ অক্টোবর- গাজায় চলমান যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এতে সম্মতি জানালেও কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়ে গেছে। তাদের ধারণা—শান্তির আড়ালে গাজার রাজনৈতিক ও ভূ–অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একটি নীলনকশা লুকিয়ে থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা মূলত গাজাকে ভূমধ্যসাগরের কূলে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহনকেন্দ্রে রূপান্তরের কৌশল। অবস্থানগত কারণে গাজা ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার মাঝামাঝি হওয়ায় এটিকে “দ্বিতীয় দুবাই” বানানোর স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা মিলবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তাও জোরদার হবে।
পরিকল্পনায় সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো একটি আন্তর্জাতিক তদারকি সংস্থা—‘বোর্ড অব পিস’। এর নেতৃত্বে থাকবেন ট্রাম্প ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। সমালোচকদের আশঙ্কা, এ বোর্ড কার্যকর হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইসরায়েলকেন্দ্রিক পক্ষপাত দেখা দেবে এবং ফিলিস্তিনিদের স্ব–নির্ধারণের অধিকার খর্ব হতে পারে।
ট্রাম্পের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, তাদের ঘাঁটি উচ্ছেদ ও গাজায় একটি অন্তর্বর্তী আন্তর্জাতিক সরকার গঠন। তবে সরকারে কারা থাকবে, কীভাবে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করা হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাস্তবে এতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের হাতে চলে যেতে পারে, যদিও এটিকে ‘অস্থায়ী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
অন্যদিকে, হামাস বলছে তারা গাজার নিয়ন্ত্রণ একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে দেখতে চায়, যা ইসলামী ও আরব রাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় গঠিত হবে এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা পাবে। অর্থাৎ হামাসকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সামরিক প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।
পরিকল্পনায় কিছু মানবিক প্রস্তাবও রয়েছে, যেমন বন্দি বিনিময়—ইসরায়েলি বন্দিদের ফেরত দেওয়া এবং আটক ফিলিস্তিনিদের মুক্তির ব্যাপারে হামাস নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল, সড়ক, বিদ্যুৎ ও পানীয়জলসহ মৌলিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত। এসব বাস্তবায়িত হলে অন্তত সাময়িক স্বস্তি আসতে পারে গাজার সাধারণ মানুষের জীবনে।
গাজাকে বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, যা বিশাল বিনিয়োগ ও স্থিতিশীলতা দাবি করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—কারা এর প্রকৃত সুবিধাভোগী হবে? স্থানীয় জনগণ নাকি আন্তর্জাতিক করপোরেট শক্তি? পূর্বের অভিজ্ঞতা বলছে, উন্নয়ন যদি স্থানীয় অংশগ্রহণ ছাড়া হয়, তবে প্রতিরোধ ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্ব কূটনীতিকদের আশঙ্কা, বহিঃশক্তির নেতৃত্বে গাজায় স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো চাপিয়ে দিলে তা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে মানবিক সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
শেষ প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—ট্রাম্পের এই ২০ দফা পরিকল্পনা কি সত্যিকারের স্থায়ী শান্তির পথ উন্মুক্ত করবে, নাকি গাজাকে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পরিণত করবে? এর উত্তর দেবে সময় এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ।
সূত্র : আনন্দবাজার