মেলবোর্ন, ২৩ অক্টোবর- দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর পর সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করল বিতর্কিত কাফালা প্রথা। এই প্রথার অবসানকে দেশটির ইতিহাসে এক বড় শ্রম সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে সৌদিতে কর্মরত প্রায় তেরো মিলিয়ন প্রবাসী শ্রমিক, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ফিলিপাইনের শ্রমিকদের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘কাফালা’ শব্দের অর্থ অভিভাবকত্ব বা স্পনসরশিপ। এই ব্যবস্থার আওতায় বিদেশি শ্রমিকদের কাজ, বসবাস ও দেশত্যাগের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকত তাদের স্থানীয় নিয়োগকর্তা বা কাফিলের হাতে। শ্রমিকরা কাফিলের অনুমতি ছাড়া চাকরি পরিবর্তন করতে পারতেন না, দেশে ফেরার জন্যও প্রয়োজন হতো বিশেষ অনুমোদনের। অনেক সময় শ্রমিকদের পাসপোর্টও নিয়োগকর্তার কাছেই থেকে যেত, যার ফলে তারা কার্যত একধরনের বন্দি অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য হতেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই কাঠামোকে দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিক দাসপ্রথা হিসেবে সমালোচনা করে আসছিল।
সৌদি সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় জানায়, কাফালা প্রথার পরিবর্তে এখন থেকে দেশটিতে কার্যকর হবে চুক্তিভিত্তিক শ্রমনীতি। নতুন আইনে শ্রমিকরা নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়াই চুক্তির মেয়াদ শেষে নতুন কর্মস্থলে যেতে পারবেন। দেশত্যাগ বা পুনঃপ্রবেশের জন্য আর কাফিলের অনুমতির প্রয়োজন হবে না, শ্রমিকরা নিজেরাই সরকারি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। তাদের পাসপোর্ট নিজেদের কাছে রাখার অধিকারও থাকবে এবং শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি আদালত বা কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে পারবেন। এছাড়া নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকের মধ্যে চুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল আইডি ও অনলাইন শ্রম রেকর্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকদের ওপর। শুধু ভারত থেকেই প্রায় ২৬ লাখ শ্রমিক সৌদিতে কাজ করছেন, আর বাংলাদেশ থেকেও কয়েক লাখ শ্রমিক রয়েছেন। নতুন নিয়মে তাদের কর্মপরিবেশ, বেতন কাঠামো ও আইনি নিরাপত্তা অনেকটা উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কাফালা প্রথা বিলুপ্তি শ্রমিক অধিকার রক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, আইনি সংস্কার কার্যকর হলেও মাঠপর্যায়ে পুরনো কাফালা সংস্কৃতির প্রভাব কাটাতে সময় লাগবে। অনেক নিয়োগকর্তা হয়তো নতুন নিয়ম মানতে চাইবেন না, আবার অনেক শ্রমিকও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে এখনও সচেতন নন। তাই সৌদি সরকার ও প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে যৌথ সচেতনতা ও মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি আরবে কাফালা প্রথার বিলুপ্তি শুধু একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে মানবাধিকারের নতুন অধ্যায় সূচনা করল। বাংলাদেশসহ অন্যান্য শ্রমপ্রেরণকারী দেশের জন্য এটি হতে পারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবনের এক নতুন দিগন্ত। তবে এই সাফল্য নির্ভর করবে কতটা কার্যকরভাবে আইনটি বাস্তবায়িত হয় এবং শ্রমিকরা তাদের অধিকার সম্পর্কে কতটা সচেতন হয়ে ওঠেন তার ওপর।
সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া