মেলবোর্ন, ২৯ অক্টোবর- তুরস্কে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বারবার ব্যর্থতা এবং পরস্পরের ওপর সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে একেবারে ‘খোলা সংঘর্ষ’-এর দিকেই ঠেলে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
তুরস্কে অনুষ্ঠিত তৃতীয় দফার আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় দুই দেশের গণমাধ্যম মঙ্গলবার একে অপরের ওপর ব্যর্থতার দায় চাপিয়েছে। পাকিস্তানের তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যারা আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান,অচলাবস্থার কারণ ছিল কাবুলের ‘যৌক্তিক ও বৈধ দাবি’ মেনে নিতে অস্বীকৃতি। ইসলামাবাদ চেয়েছিল, আফগানিস্তান নিশ্চিত করবে যে তাদের ভূখণ্ড পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার হবে না।
অন্যদিকে, আফগান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম RTA জানিয়েছে, তাদের প্রতিনিধিরা “গঠনমূলক আলোচনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে”, কিন্তু পাকিস্তান “কঠোর মনোভাব ও অনমনীয় অবস্থান” ধরে রেখেছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জবাবে বলা হয়, “অগ্রগতি এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আফগানিস্তানের ইতিবাচক মনোভাবের ওপর।”
এই অচলাবস্থা ভারতের কূটনৈতিক মহলেও আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। দিল্লি বরাবরই অভিযোগ করে এসেছে যে পাকিস্তানের সেনা গোয়েন্দা সংস্থা (ISI) ভারতের সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সন্ত্রাসী হামলার অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ দেয়। তাই এখন ইসলামাবাদ নিজেই একই অভিযোগে অন্য দেশের মুখোমুখি,এটি ভারতের দৃষ্টিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিস্থিতি।
এই ব্যর্থ আলোচনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাওয়াজা আসিফের সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেন,
“যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে ইসলামাবাদের কাছে ‘খোলা সংঘর্ষে জড়ানো’ ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।”
তার এই মন্তব্য বিশ্ব কূটনীতিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় ১৮–১৯ অক্টোবর দোহায়, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায়। লক্ষ্য ছিল সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং দুই দেশের মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা বাড়ানো। তবে তৃতীয় দফার পর থেকে কোনো নতুন আলোচনার তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)-কে আশ্রয় দিচ্ছে,যা আফগান তালেবানের মতাদর্শিক মিত্র। পাকিস্তানের দাবি, এই সংগঠনই তাদের দেশে একাধিক সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী। তবে আফগান তালেবান এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।
এমনকি পাকিস্তান সম্প্রতি আফগানিস্তানের ভেতরে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে, যা তারা দাবি করেছে “সন্ত্রাসী ঘাঁটি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে” করা হয়েছে। আফগান সরকার এসব হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে।
ইসলামাবাদ জানায়, এই অভিযানে “ডজনখানেক আফগান জঙ্গি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছে” এবং “অসংখ্য সামরিক পোস্ট ধ্বংস করা হয়েছে।” তবে তালেবান বলেছে, এই হামলায় ১২ জন বেসামরিক নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে। পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সীমান্তজুড়ে নতুন করে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। রোববার পাকিস্তান সেনাবাহিনী দাবি করেছে, “সন্ত্রাসীরা সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছিল,” এবং তাদের প্রতিহত করতে গিয়ে কয়েকজন নিহত হয়েছে। ইসলামাবাদের মতে, এসব অনুপ্রবেশ আফগান সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
অন্যদিকে, আফগান তালেবান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও দৃশ্যত উন্নতির দিকে। অক্টোবরের শুরুতে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুতাকি দিল্লিতে এক সপ্তাহব্যাপী সফরে যান।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারত ঘোষণা করেছে, তারা আফগানিস্তানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করবে এবং খুব শিগগিরই কাবুলে তাদের টেকনিক্যাল মিশনকে দূতাবাসে উন্নীত করবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ওই সফরে মুতাকি পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা করেন, যা পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। তিনি ভারতের প্রতি আশ্বাস দেন যে, আফগানিস্তানের মাটি কখনোই ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যর্থ শান্তি আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক নিরাপত্তা সংকটের সূচনা করতে পারে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয়ই যদি সংঘর্ষের পথে এগোয়, তবে এর প্রভাব পড়বে পুরো অঞ্চলে বিশেষত ভারত, চীন ও ইরানের কৌশলগত অবস্থানেও।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সংলাপ পুনরায় শুরু না হলে, পাক-আফগান সীমান্তে “খোলা যুদ্ধ” বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে যা বিশ্ব শান্তির জন্য এক ভয়াবহ বার্তা বহন করবে।