সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুস। গ্রাফিক্স ছবি: ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন ৩ নভেম্বর: ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যেসব নেতা “বিপ্লবী বৈধতা”র দাবি করে সংবিধান-বহির্ভূত ক্ষমতা দখলের যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন, তাঁদের পরিণতি গণতন্ত্র নয়, বরং ধর্মতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রে গিয়েই থেমেছে। আজ বাংলাদেশেও সেই ইতিহাস যেন পুনরাবৃত্ত হচ্ছে নীরবে, ধীরে, এবং পরিকল্পিতভাবে।
বাংলাদেশে এক “নীরব অভ্যুত্থান” এখন বাস্তবতা। শাসনকার্যের আড়ালে, ইসলামী সংগঠন, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও উগ্রপন্থী মতাদর্শীরা মিলিতভাবে দেশের সবচেয়ে পেশাদার ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ভেঙে ফেলার এক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
এই অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী ড. মুহাম্মদ ইউনুস যিনি একসময় নোবেলজয়ী হিসেবে প্রশংসিত ছিলেন, আর এখন ক্রমশ ধর্মীয় মতাদর্শে ঝুঁকে পড়া এক শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। এর ঝুঁকি শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর জন্যও।
বিচার ট্রাইব্যুনাল ও সেনাবাহিনীর উপর আঘাত
বাংলাদেশের তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) সম্প্রতি ৩২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, যার মধ্যে ২৫ জন বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা। অভিযোগ “মানবতাবিরোধী অপরাধ” ও “গুমের ঘটনা”। ২২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তাঁদের আদালতে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়, এবং ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে সঙ্গে সঙ্গে আটক করা হয়।
এই ট্রাইব্যুনাল কোনও আন্তর্জাতিক আদালত নয়, বরং একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, যার লক্ষ্য সেনাবাহিনীর নেতৃত্বকে ভয় দেখানো, অসম্মান করা এবং শেষ পর্যন্ত ভেঙে ফেলা। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এই তালিকা আরও বড় হতে পারে মোট ১৫০ জন পর্যন্ত কর্মকর্তা এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, যার মধ্যে তিন বাহিনীর প্রধানও থাকতে পারেন।
ইসলামী জোট ও গোপন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম
২০ অক্টোবর ২০২৫-এ আরেক বিস্ময়কর তথ্য সামনে আসে। ড. ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঘোষণা করেন যে, সাতটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মোট ৮,৮৫০ জনকে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যেখানে শেখানো হচ্ছে মার্শাল আর্ট, জুডো, তায়কোয়ান্ডো ও অস্ত্রচালনা।
ঢাকার অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, এটি প্রথম ধাপ পরবর্তী ধাপগুলোতে আরও কয়েক ব্যাচ প্রশিক্ষিত হবে। প্রশিক্ষণের দায়িত্বে আছেন পাকিস্তানের আইএসআই ও তুরস্কের এমআইটির (MIT) প্রতিনিধিরা। এদের অনেককে ভবিষ্যতে ভারতে, নেপালে, মিয়ানমারে ও পশ্চিমা দেশগুলোতে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে, গুপ্তচর বা ধ্বংসাত্মক মিশনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে।
‘জুলাই চার্টার’ ও ইসলামী রাষ্ট্রের নকশা
অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন তৈরি হচ্ছে এক “নতুন কাঠামো” যেখানে ড. ইউনুস নিজেকে “জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা”র একমাত্র ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রকাশ্যে বলেছেন, “ইউনুস সাহেবই জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি। প্রেসিডেন্ট শাহাবুদ্দিন চুপ্পু নন।”
এই বক্তব্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে বাংলাদেশে এক ইরানীয় ধাঁচের ‘সুপ্রিম লিডার’ মডেল গড়ে তোলা হচ্ছে। সংবিধান-বহির্ভূত অথচ ‘বিপ্লবী বৈধতা’র দাবিতে যে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তা এক ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনা।
সেনাবাহিনীর মনোবল ভাঙার কৌশল
একদিকে সংবিধানকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর উপর ভয়াবহ দমননীতি। যেসব অফিসাররা পূর্ববর্তী সরকারের সময় নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁদের “অপরাধী” বানিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে, অথচ একই সময় প্রকৃত অপরাধীরা রেহাই পাচ্ছে।
যেমন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান, যিনি বিএনপি আমলে র্যাব এ কর্মরত অবস্থায় বহু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, এখন নিজেকে “ভিকটিম” হিসেবে উপস্থাপন করছেন। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়িত থাকার দায়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে চার বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন সামরিক আদালত। এ সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল তাকে। হাসিনুর রহমান দীর্ঘদিন র্যাব-৯ এর অধিনায়ক ছিলেন। এসময় তার সঙ্গে কর্মরত ছিলেন আবদুল্লাহ আলী যায়ীদ। নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহ্রীসহ উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে হাসিনুর রহমান এবং যায়ীদকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
এছাড়া ২০০৪–২০০৫ সালে র্যাব-৭ এর অধিনায়ক থাকার সময় লে. কর্নেল হাসিনুর রহমানের নেতৃত্বে গ্রেপ্তারের পরপরই ‘ক্রসফায়ার’-এ হত্যার ধারাবাহিক ঘটনা ঘটেছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া হাসিনুর রহমান হরকাতুল জিহাদের নেতা মাওলানা ইয়াহিয়ার সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করা, হিযবুত তাহরীর তিন সদস্যের সঙ্গে দেখা করা, চট্টগ্রামে একজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির ব্যাপারে টেলিফোনে বিদেশি এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনালাপ করা, পার্বত্য চুক্তিবিরোধী একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, সেনা অভিযানের খবর ফাঁস করে দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগেও অভিযুক্ত ছিলেন।
একইভাবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী এখন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তা।
অন্যদিকে পেশাদার ও যোগ্য কর্মকর্তাদের শুধুমাত্র ‘পূর্ব সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালনের’ কারণে বিচারের মুখে ফেলা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর ভেতরে এখন স্পষ্ট বার্তা ‘ন্যায় নয়, আনুগত্যই টিকে থাকার শর্ত’।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
ইতিহাস বলে যখন কোনো নেতা “বিপ্লবের বৈধতা” দাবি করে আইনের বাইরে দাঁড়ান, তখন গণতন্ত্র নয়, জন্ম নেয় একনায়কতন্ত্র। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবেও ঠিক এই প্রক্রিয়া ঘটেছিল ‘জনগণের নামে’ ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, আর জন্ম নেয় ধর্মতান্ত্রিক শাসন।
বাংলাদেশেও এখন একই দৃশ্যপট “জুলাই বিপ্লব”–এর নামে ক্ষমতা দখলের নীলনকশা তৈরি হচ্ছে, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে আইনি কাঠামো ভেঙে ফেলা হচ্ছে, আর দেশকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সম্ভাব্য ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্রের দিকে।
ভবিষ্যতের পথ
বাংলাদেশ এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ড. ইউনুস ও তাঁর সহযোগীরা যে কাঠামো গড়ে তুলছেন তা গণতন্ত্র নয়, বরং এক ব্যক্তিনির্ভর শাসনের ছদ্মাবরণ। এর ফল হবে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়বে, সেনাবাহিনী দুর্বল হবে, এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ কি ইরানের পথেই হাঁটছে? ইতিহাস বলছে এই পথের শেষ কোথায়, তা অনুমান করাও কঠিন নয়।
সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী একজন সাংবাদিক, লেখক এবং দৈনিক ‘Blitz’-এর সম্পাদক। তিনি সন্ত্রাসবিরোধী বিশ্লেষণ ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বিশেষজ্ঞ। মতামতটি লেখকের নিজস্ব- সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।