চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
বিশ্লেষণ-আমল দত্ত
মেলবোর্ন, ৪ নভেম্বর- বাংলাদেশ যখন তার ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, তখন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জাতীয় রাজনীতি থেকে ক্রমাগত বঞ্চিত হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীর তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অংশগ্রহণ ও বহুত্ববাদের অঙ্গীকার থাকলেও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে।
প্রথম আলো (৪ নভেম্বর ২০২৫)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ২৩৭ প্রার্থীর মধ্যে মাত্র দুইজন হিন্দু প্রার্থী মনোনীত করেছে— মাগুরা-২ আসনে নিতাই রায় চৌধুরী ও ঢাকা-৩ আসনে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। অর্থাৎ, মোট প্রার্থীর মাত্র ০.৮ শতাংশ, যেখানে সংখ্যালঘুরা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৯৫ শতাংশ (জনশুমারি ২০২২)। এই বৈষম্য বিএনপির নিজেদের ঘোষিত “ভিশন ২০৩০”-এর বহুত্ববাদী “রেইনবো নেশন” গঠনের অঙ্গীকারের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।
জামায়াতে ইসলামি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ২৯৬ প্রার্থীর তালিকায় একজনও সংখ্যালঘু প্রার্থী রাখেনি (দৈনিক যুগান্তর, ১৫ জুন ২০২৫)। অথচ একই সঙ্গে দলটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে ভোট চাইছে, নির্বাচিত হলে তাদের সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস দিয়ে। কথার সঙ্গে কাজের এই সুস্পষ্ট বৈপরীত্য বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি রাজনৈতিক অসততা ও অবজ্ঞার প্রতিচ্ছবি।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এটি সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে উদ্দেশ্যমূলক ও কাঠামোগতভাবে বাদ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। তারা সতর্ক করেছেন, আসন্ন নির্বাচনটি সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিকভাবে বিলুপ্ত করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বিপজ্জনক।
প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে পতন
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা জাতীয় রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে ছিলেন। পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের মধ্যে তাদের অংশ ছিল ১০.৬৫ শতাংশ। কিন্তু স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তা কমে দাঁড়ায় ৫ শতাংশে। নতুন রাষ্ট্র তখন অন্তর্ভুক্তি ও পরিচয়ের সংকটে লড়াই করছিল।
পরবর্তী দশকগুলোতে এই হার আরও কমতে থাকে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সংখ্যালঘুরা মাত্র ৪ শতাংশ আসন পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে তা নেমে আসে ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন ২.৬৭ শতাংশে, যখন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করে।
২০০৮ সালে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়, তখন সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৬৭ শতাংশে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংখ্যালঘু সংসদ সদস্য ছিলেন ৫.৭১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২০ জন (সংরক্ষিত আসনসহ)। তবে দীর্ঘ সময়ের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সামান্য অগ্রগতি এলেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ অব্যাহত রয়েছে।
হারিয়ে যাওয়া ২৪ আসন: গণতন্ত্রের ঘাটতি
জনসংখ্যার অনুপাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জাতীয় সংসদের অন্তত ২৪টি আসনে থাকা উচিত। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে তাদের প্রতিনিধিত্ব নগণ্য পর্যায়ে নেমে আসছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি শুধু রাজনৈতিক বঞ্চনাকেই আরও গভীর করবে না, বরং সংখ্যালঘু নাগরিকদের মধ্যে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা দুর্বল করবে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সব রাজনৈতিক দলকে সংখ্যালঘুদের অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, এটি কেবল ন্যায্যতার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি ও গণতান্ত্রিক বৈধতার জন্যও অপরিহার্য।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সামনে আসন্ন সংকট
বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় নির্বাচন গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের পরিবর্তে জাতিগত ও ধর্মীয় বর্জনের আরও গভীর পর্ব হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
যদি রাজনৈতিক দলগুলো দেশের প্রায় ৮ শতাংশ নাগরিককে নির্বাচনীভাবে গুরুত্ব না দেয়, তবে বাংলাদেশ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী গণতন্ত্র হিসেবে তার নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি হারাবে।
সবশেষে বলা যায়, “রেইনবো নেশন” বা রঙিন জাতি গঠনের স্বপ্ন তখনই বাস্তব হবে, যখন কেউ সেই রঙগুলিকে মুছে ফেলবে না।
লেখক-আমল দত্ত, সিপিএ | পরিচালক, বাংলাদেশে নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ফেডারেশন (AFERMB) | মানবাধিকার কর্মী
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au