মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ এই শাটডাউনের কারণে ১৩ হাজার বিমান নিয়ন্ত্রক এবং ৫০ হাজার পরিবহন নিরাপত্তা কর্মকর্তা কোনো বেতন ছাড়াই কাজ করছেন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৬ নভেম্বর- যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি বুধবার ঘোষণা করেছেন, সরকারি অচলাবস্থা (শাটডাউন) ৩৬তম দিনে পৌঁছানোর পর বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় ৪০টি বড় বিমানবন্দরে ফ্লাইট ১০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে মাত্র দেড় দিনের মধ্যে বিমান সংস্থাগুলোকে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে, আর যাত্রীরা টিকিট পরিবর্তন বা বাতিলের বিষয়ে জানতে বিমান সংস্থার কাস্টমার সার্ভিসে ভিড় জমাচ্ছেন।
ডাফি জানিয়েছেন, যদি ডেমোক্র্যাটরা সরকার পুনরায় চালু করতে রাজি হয়, তবে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হতে পারে।
মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ এই শাটডাউনের কারণে ১৩ হাজার বিমান নিয়ন্ত্রক এবং ৫০ হাজার পরিবহন নিরাপত্তা কর্মকর্তা কোনো বেতন ছাড়াই কাজ করছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন ডেমোক্র্যাটদের ওপর চাপ বাড়াতে এই শাটডাউনকে কাজে লাগাচ্ছে, যাতে তারা কংগ্রেসে অর্থায়ন বিল পাসে সম্মত হয়। ডেমোক্র্যাটরা বলছে, রিপাবলিকানরা স্বাস্থ্যবিমা ভর্তুকি নিয়ে সমঝোতায় রাজি না থাকায় পরিস্থিতির জন্য তারাই দায়ী।
নিয়ন্ত্রণ সংকট ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
শাটডাউনের পর থেকে বিমান নিয়ন্ত্রকের ঘাটতির কারণে হাজার হাজার ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৩২ লাখ যাত্রী এর প্রভাব ভোগ করেছেন বলে জানিয়েছে বিভিন্ন এয়ারলাইন।
ডাফি বলেন, “আমাদের মূল দায়িত্ব হলো আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হচ্ছে।”
রয়টার্স জানিয়েছে, ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) বিমান সংস্থাগুলোকে জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে ধাপে ধাপে ফ্লাইট কমানো হবে। প্রথমে ৪ শতাংশ, শনিবারে ৫ শতাংশ, রবিবারে ৬ শতাংশ এবং আগামী সপ্তাহে ১০ শতাংশে পৌঁছাবে। তবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো এই কাটছাঁটের আওতার বাইরে থাকবে।
এফএএ প্রশাসক ব্রায়ান বেডফোর্ড বলেন, “এই ৪০টি অঞ্চলে চাপ বাড়ছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। আমরা চাই আগামীকালও আকাশপথ যেন আজকের মতোই নিরাপদ থাকে।”
সরকার নির্দিষ্ট করে জানায়নি কোন ৪০টি বিমানবন্দর এ সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বে, তবে ধারণা করা হচ্ছে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, শিকাগো, আটলান্টা, লস অ্যাঞ্জেলেস ও ডালাসসহ সবচেয়ে ব্যস্ত ৩০টি বিমানবন্দর এর মধ্যে থাকবে। এর ফলে প্রায় ১,৮০০টি ফ্লাইট ও ২ লাখ ৬৮ হাজার আসন কমে যেতে পারে বলে জানিয়েছে বিমান বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সিরিয়াম।
চূড়ান্ত নির্দেশ বৃহস্পতিবার এফএএ প্রকাশ করবে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে সংস্থাটির কর্মীসংখ্যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩,৫০০ জন কম, আর নিয়ন্ত্রকদের অনেকে টানা ছয় দিন কাজ করছেন।
বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া
এফএএ জানিয়েছে, শুক্রবারের পরও পরিস্থিতি খারাপ হলে আরও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হতে পারে।
ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী স্কট কারবি বলেন, দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক ও প্রধান বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে ফ্লাইট অপরিবর্তিত থাকবে, তবে আঞ্চলিক ও ছোট রুটে কাটছাঁট করা হবে।
তিনি কর্মীদের জানান, “যারা এই সময় ভ্রমণ করতে চান না, তারা ক্ষতিপূরণ পাবেন— এমনকি তাদের ফ্লাইট বাতিল না হলেও।”
আমেরিকান এয়ারলাইন্সও জানিয়েছে, অধিকাংশ যাত্রী তেমন বিঘ্নের মুখে পড়বেন না।
অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম (সাউথওয়েস্ট) এয়ারলাইন্স বলেছে, তারা সময়সূচির ওপর প্রভাব পর্যালোচনা করছে এবং দ্রুত যাত্রীদের জানানো হবে। প্রতিষ্ঠানটি কংগ্রেসকে অচলাবস্থা অবসানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
২০টি এয়ারলাইন্সের ৫৫ হাজার ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টস-সিডব্লিউএ এই শাটডাউনকে “সব আমেরিকানের ওপর নিষ্ঠুর আঘাত” বলে মন্তব্য করেছে। সংগঠনের সভাপতি সারা নেলসন বলেন, “যারা এই সংকট তৈরি করেছে, তারাই এখন বলছে ফেডারেল কর্মীদের বেতন বা স্বাস্থ্যসেবা বেছে নিতে হবে- এটি সম্পূর্ণ ভুয়া দ্বন্দ্ব।”
সংকটের গভীরতা
অচলাবস্থা ১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ফেডারেল কর্মী বেতনবঞ্চিত হয়েছেন এবং অনেক নিম্নআয়ের পরিবার খাদ্য সহায়তা হারিয়েছে।
ডাফি মঙ্গলবারই সতর্ক করেছিলেন, যদি শাটডাউন আরও এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে “পুরো বিমান চলাচলে বিশৃঙ্খলা” দেখা দিতে পারে এবং আংশিক আকাশসীমা বন্ধ করতে হতে পারে।
বিমান সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে, শাটডাউন অব্যাহত থাকলে বিমান নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। বুধবার ২,১০০টির বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়।
এদিকে মঙ্গলবার এফএএ জানিয়েছে, ৩০টি প্রধান বিমানবন্দরের ২০ থেকে ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রক কাজে অনুপস্থিত।
ডাফি বলেছেন, মহাকাশ উৎক্ষেপণেও সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে এবং সাধারণ বিমান চলাচলে অতিরিক্ত সীমাবদ্ধতা আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
সুত্রঃ রয়টার্স