সর্বশেষ

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অদৃশ্য ক্ষতির হিসাব রাখছে নতুন এক প্ল্যাটফর্ম

  • 6:56 am - November 07, 2025
  • পঠিত হয়েছে:২৪২ বার
ক্ষতিগ্রস্ত ফসল, ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি, মানসিক আঘাত, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, এমনকি সংস্কৃতিগত ক্ষতি; ড্যাশবোর্ডটি এসব দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ক্ষতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৭ নভেম্বর- জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি ও ধ্বংস এখন বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ, জলবায়ু সংকট সৃষ্টিকারী নিঃসরণে খুব কম অবদান রেখেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। এটি জলবায়ু অন্যায়ের এক স্পষ্ট উদাহরণ।

বাংলাদেশে অক্সফাম, অক্সফাম অস্ট্রেলিয়া এবং সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার (Sida) সহায়তায় তৈরি করেছে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ড্যাশবোর্ড’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। এটি একেবারে নতুন, অংশগ্রহণমূলক ও রিয়েল-টাইম ডেটা সিস্টেম, যেখানে স্থানীয় মানুষ নিজেরাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের অর্থনৈতিক ও অনার্থিক ক্ষতির তথ্য নথিভুক্ত করতে পারেন। এই ধরনের তথ্য সাধারণত জাতীয় পর্যায়ের দুর্যোগ প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয় না।

বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে চালু এই প্ল্যাটফর্মে স্থানীয়রা মোবাইল ফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষতির তথ্য দিতে পারেন। এরপর সেগুলো যাচাই করা হয় জলবায়ু বিষয়ক তথ্য ও গুগল আর্থ ইঞ্জিনের স্যাটেলাইট ডেটার সঙ্গে মিলিয়ে।

ক্ষতিগ্রস্ত ফসল, ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি, মানসিক আঘাত, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, এমনকি সংস্কৃতিগত ক্ষতি; ড্যাশবোর্ডটি এসব দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ক্ষতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে। এটি দেখাচ্ছে, জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রকৃত খরচ আসলে কত গভীর ও বহুমাত্রিক।

২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৯ জেলায় ১১ হাজার ৫০০টিরও বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৭ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার (প্রায় ১২৫ কোটি টাকা)। প্রতি ব্যক্তি গড়ে প্রায় ১,৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার ক্ষতির কথা জানিয়েছেন, যা একজন গড় বাংলাদেশির ১৫ মাসের আয়ের সমান।

সবচেয়ে বড় ক্ষতির বিভাগটি ছিল না কৃষি বা অবকাঠামো, বরং অনার্থিক ক্ষতি। এর মধ্যে রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা। বিশেষত নারীরা জানিয়েছেন, তারা জলবায়ুজনিত খাদ্যসংকট, অনিরাপদ পরিবেশ ও পানিবাহিত রোগের কারণে পুষ্টিহীনতা, ত্বকের রোগ, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা ও মানসিক চাপের মুখে পড়ছেন। সাধারণত এসব বিষয় নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্ব পায় না, কিন্তু ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে এখন তা দৃশ্যমান হচ্ছে।

জলবায়ু কর্মসূচিতে ‘ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ’ (Loss and Damage) এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশমন (mitigation) ও অভিযোজনের (adaptation) পর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিষয়টি নতুন গতি পেয়েছে COP28 সম্মেলনে প্রতিষ্ঠিত ‘Fund for Responding to Loss and Damage (FRLD)’ ঘোষণার মাধ্যমে, যা উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তা করবে।

তবে বাস্তবতা হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ুজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ যেখানে ৪০০ বিলিয়ন থেকে ১.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে FRLD-তে এখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ৭৬৮.৪ মিলিয়ন ডলার, এবং এর মধ্যে প্রদান করা হয়েছে প্রায় ৪০১ মিলিয়ন ডলার। আগামী সপ্তাহে COP30-এ চালু হচ্ছে তহবিলের ২৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক ধাপ ‘Barbados Implementation Mechanism’। তাই মাঠপর্যায়ের সঠিক তথ্যের এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

এই ড্যাশবোর্ড আন্তর্জাতিক আলোচনা থেকে বাস্তবতার মাটিতে নজর ফেরাতে সাহায্য করছে। এটি দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে প্রতিদিন ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ক্ষতির সঙ্গে লড়ছে। স্থানীয় নেতৃত্বে, সম্প্রদায়নির্ভর উদ্যোগ হিসেবে এটি বিশ্বকে দেখাচ্ছে, গ্রামীণ পর্যায় থেকেই কীভাবে কার্যকর জলবায়ু সমাধান তৈরি করা যায়।

অস্ট্রেলিয়া, বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উচ্চ-নিঃসরণকারী দেশ হিসেবে, জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে থাকার দায়িত্ব রাখে। দেশটি COP29-এ FRLD তহবিলে ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং একই সঙ্গে Pacific Resilience Facility-তে আরও ১০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে, যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ-প্রস্তুতিমূলক প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে।

তবে শুধু অর্থ নয়, অস্ট্রেলিয়ার উচিত নিশ্চিত করা যে এই তহবিলগুলো সরাসরি স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছে, এবং Loss and Damage Dashboard-এর মতো টুল যেন আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহার হয়। বৈশ্বিক ফোরামে জলবায়ু অর্থায়ন ও নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া ভূমিকা রাখলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত ক্ষতি আর অদৃশ্য বা অবহেলিত থাকবে না।

সুত্রঃ Source: Devpolicy Blog from the Development Policy Centre

এই শাখার আরও খবর

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের হুমকিতে অস্বস্তিতে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি, চাপে প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানির…

দিল্লিতে হঠাৎ এনএসআই মহাপরিচালক, আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সারওয়ার ফরিদের দিল্লি সফরকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য…

সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না পুলিশ: আইজিপি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে এবং প্রয়োজন হলে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও কমিউনিটি…

নভেম্বরে ঢাকায় ইজতেমা, পাকিস্তান থেকে আসছেন শীর্ষ ধর্মীয় নেতারা

পাকিস্তানভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামি সংগঠন দাওয়াতে ইসলামী আগামী ১৮ থেকে ২০ নভেম্বর ঢাকায় তিন দিনব্যাপী ‘সুন্নাহ-অনুপ্রাণিত ইজতেমা’ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে উত্তরা সেন্টার মেট্রোরেল…

ভোটারদের প্রভাবিত করতে যেভাবে এআই ব্যবহার করছেন মার্কিন রাজনীতিকেরা

নির্বাচনে ভোটারদের সমর্থন পেতে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটকে নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করার কৌশল নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রার্থীরা। চ্যাটজিপিটি, ক্লড ও জেমিনির মতো এআই…

অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় বাপার দুর্গাপূজার ২০ বছর

ওটিএন বাংলা, ক্যানবেরা: দেবীর আরাধনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আর প্রজন্মের মেলবন্ধনে দুর্গাপূজা আয়োজনের দুই দশক উদ্‌যাপন করল বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া পূজা অ্যাসোসিয়েশন—বাপা। ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর ক্যানবেরায়…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au