‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ১০ নভেম্বর- বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর এক বছর পেরিয়ে গেছে। যে আন্দোলন এক সময় আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তা এখন হতাশার ছায়ায় ঢেকে গেছে।
আট বছর অন্ধকার কারাগারে কাটিয়েছেন মীর আহমদ বিন কাসেম। মশার কামড়ে, তেলাপোকা ও ইঁদুরের যন্ত্রণায় দিন গুনেছেন।
তিনি বলেন, “কিছুই করার ছিল না। প্রতিদিন-রাত শুধু প্রস্তুতি নিতাম, এই বুঝি ফাঁসি দিতে নিয়ে যাবে।”
২০১৬ সালে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে তার বাবা জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার আইনজীবী হওয়ার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাকে রাখা হয়েছিল ‘হাউস অব মিররস’ নামে এক কারাগারে। যেখানে বন্দিদের চোখ বেঁধে একাকী রাখা হতো।
গত বছরের ৬ আগস্ট ভোরে হঠাৎ তাকে কারাগার থেকে টেনে বের করে আনা হয়। “আমি ভেবেছিলাম আমাকে ফাঁসি দিতে নিয়ে যাচ্ছে, তাই শেষ দোয়া পড়ে ফেলি,” বলেন কাসেম। কিন্তু তাকে শহরের বাইরে এক ফাঁকা মাঠে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি তখন মুক্ত মানুষ।
এর আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্রনেতৃত্বাধীন “মনসুন বিপ্লব”-এর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়। হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। কাসেম বলেন, “যখন শুনলাম আমরা ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হয়েছি, আমি কেঁদে ফেলেছিলাম।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সূচনা
সরকার পতনের পর ছাত্রনেতারা নতুন ভবিষ্যতের জন্য একত্রিত হন। তারা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আহ্বান জানান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্ব দিতে।
এই সরকারের দায়িত্ব ছিল বিশাল: আওয়ামী লীগের দখলে থাকা রাজনৈতিক, সামাজিক, বিচারিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন, ১৫ বছরের শাসনকালে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিচার করা, এবং দুর্নীতিতে হারানো বিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা।
কিন্তু নতুন নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ১৭ কোটি মানুষের দেশটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা ইউনূসের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
হতাশ তরুণরা
ছাত্র আন্দোলনের তরুণরা এখন হতাশ। তারা যে ‘নতুন রাজনৈতিক চুক্তি’র স্বপ্ন দেখেছিল, তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। পুরনো রাজনৈতিক পরিবারগুলো আবারও সক্রিয় হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশে বেড়েছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, উগ্র ইসলামপন্থার আতঙ্ক। আর আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের বহু কর্মী খুন হয়েছে।
ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনকে প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানোর (‘লফেয়ার’) জন্য। সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে, অভিযোগ করেছে যে দলটি গত বছরের সহিংস আন্দোলনে দায়ী।
৮৫ বছর বয়সী ইউনূস বলেছেন, “যারা গণআন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, তাদের ঐক্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবেই আমরা আমাদের সংগ্রামের সাফল্য রক্ষা করতে পারব।”
কিন্তু অনেকেই এখন মনে করছেন, এই বিপ্লব হয়তো কেবল এক ‘মিথ্যা ভোর’।
ঢাকার শান্তি ও নিরাপত্তা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো শফকাত মুনির বলেন, “আমাদের একবার জাতীয় ঐক্য হয়েছিল, কিন্তু এখন তা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছি, শুধু রাজনৈতিক দলে নয়, সমাজের ভেতরেও।”
প্রতিশোধের আগুন
ঢাকার রাস্তায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আহ্বান এখনও স্পষ্ট। ব্যানারে তার ছবির নিচে লেখা, “জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণহত্যার মূল হোতা হাসিনার ফাঁসি চাই।” জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত বছরের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়। যাদের মধ্যে অনেক শিশু ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া। তিনি হাসিনা সরকারের সময়ের গুম ও হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করেন।
জুলাইয়ে হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার শেষ হয়েছে, রায় আসছে আগামী সপ্তাহে।
তাজুল ইসলাম বলেন, “হত্যার আদেশ, পরিকল্পনা, উসকানি এবং সহায়তার জন্য আমি হাসিনার মৃত্যুদণ্ড চাই ।”
ঢাকা ভারতকে হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে, তবে দিল্লি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। হাসিনা লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, এই বিচার “রাজনৈতিক প্রহসন”, যা “ক্যাঙ্গারু আদালত” পরিচালনা করছে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ
ছাত্র ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের ওপর চাপ দেয় আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে সরাতে। মে মাসে সরকার “জাতীয় নিরাপত্তা”র অজুহাতে দলটিকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকার আদালতের মাধ্যমে নয়, সরাসরি নির্বাহী আদেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী ব্যবহার করে।
ভারতের কলকাতায় অবস্থানকারী আওয়ামী লীগ নেতারা অভিযোগ করেন ইউনূস রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিচ্ছেন।
দলের জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, “ইউনূস দেশকে বিভক্ত করছেন এবং প্রহসনমূলক নির্বাচন আয়োজন করছেন, যা গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে অসম্ভব করে তুলছে।”
হাসিনা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমাদের কোটি কোটি সমর্থক ভোটে অংশ নেবে না।”
তবে ড. ইউনূস বলেছেন, “জাতীয় নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে, এবং কোনো ষড়যন্ত্রই তা ঠেকাতে পারবে না।”
বিএনপির প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিএনপি এখন রাজনীতিতে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি পরবর্তী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে, আর তারেক রহমান দেশের পরবর্তী নেতা হতে পারেন।
২০০৮ সাল থেকে তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে আছেন, দুর্নীতির অভিযোগে যা তিনি রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
তারেক রহমান বলেছেন, “আসল বিপ্লব তখনই হবে যখন সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। পরিবর্তন আনতে হলে মানুষের ম্যান্ডেট প্রতিফলিত হতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “আমার দেশে ফেরার সময় খুব কাছেই।”
তবে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা আশঙ্কা করছেন, বিএনপি ফিরে এলে পুরনো রাজনীতি আবার ফিরে আসবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, “গত বছরের আন্দোলন ছিল পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে এক প্রত্যাখ্যান। মানুষ শুধু সরকার পতন চায়নি, তারা চেয়েছিল ন্যায়, জবাবদিহি ও মর্যাদার রাজনীতি।”
ভারসাম্যের রাজনীতি ও অর্থনীতি
যে-ই ক্ষমতায় আসুক, তাকে চীন ও ভারতের প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে এবং ২০ শতাংশ মার্কিন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে হবে।
ইউনূস সরকার অর্থনীতি স্থিতিশীল করেছে, দুর্নীতিতে জর্জরিত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান মনসুর বলেন, “আমরা ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছি।”
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তবে তারা সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে।
সরকার এখন হাসিনা পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা করেছে, যার মধ্যে আছেন ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক ও সায়মা ওয়াজেদ। হাসিনা পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইউনূস সরকারের লক্ষ্য প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের। অর্থনীতিবিদ মুশতাক খান বলেন, “যারা দেশ লুট করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারলে ভবিষ্যতে কেউ আর এমনটা করার সাহস পাবে না।”
তবে অভিযুক্ত কিছু ব্যবসায়ী আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
এক জ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ী বলেন, “ইউনূস সংস্কার করেছেন, হাসিনার বিচার করেছেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের আহ্বান দিয়েছেন। সব ভালো, কিন্তু তার চারপাশের লোকেরা বাস্তবতা বুঝতে পারছে না।”
ঢাকার কেন্দ্রীয় জমানা হাউসে ইউনূসের অস্থায়ী কার্যালয়ে এখন গর্বের সঙ্গে ক্লান্তি মিশে আছে। এক ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা বলেন, “প্রফেসর ইউনূস খুবই ভদ্র মানুষ, কিন্তু বাংলাদেশের মতো কঠিন দেশ চালাতে হয়তো অতিরিক্ত ভদ্র। আশা করি ইতিহাস তার প্রতি সদয় হবে।”
সুত্রঃ The Financial Times
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au