রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে আজ সোমবার সকালে তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১০ নভেম্বর- বাংলাদেশের গির্জা ও একটি স্কুলে ধারাবাহিক বোমা হামলার ঘটনায় দেশটির খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এই ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ জানায়, ৯ নভেম্বর পর্যন্ত তিনটি আলাদা ঘটনায় অপরিচিত হামলাকারীরা অল্প ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা নিক্ষেপ করে দুটি গির্জা ও একটি ক্যাথলিক স্কুলে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও হামলাগুলোকে ‘ভয় সৃষ্টির উদ্দেশ্যে’ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ মুখপাত্র মোহাম্মদ তালেবুর রহমান।
তিনি বলেন, “আমরা এখনো খতিয়ে দেখছি এই ঘটনাগুলো পরস্পর সম্পর্কিত কি না। তবে এটি নিশ্চিত যে এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে আতঙ্কিত করা।”
দক্ষিণ এশিয়ার এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে প্রায় ১৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে খ্রিস্টানদের সংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখের মতো। এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী এসব হামলার দায় স্বীকার করেনি। কিংবা কেন খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করা হলো তাও স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকার ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে পতনের পর থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। এই অবস্থায় গির্জায় হামলার ঘটনা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
গত ৯ নভেম্বর ঢাকায় একটি গির্জায় প্রার্থনা শেষে একজন তরুণ জানান, “এখন চার্চে যেতেও ভয় লাগে। আমরা এক ধরনের অজানা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।”
প্রথম হামলাটি ঘটে প্রায় মাসখানেক আগে ৮ অক্টোবর। সেদিন ঢাকার প্রাচীনতম গির্জা হলি রোজারি ক্যাথলিক চার্চে হামলা হয়। ১৭শ শতকে পর্তুগিজ মিশনারিরা এই গির্জা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ৭ নভেম্বর আরও দুটি স্থানে হামলা হয় যার একটি সেন্ট মেরিজ ক্যাথেড্রাল এবং আরেকটি সেন্ট যোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজে।
বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপ সম্মেলনের সমাজ যোগাযোগ কমিশনের সাধারণ সম্পাদক ফাদার বুলবুল অগাস্টিন রিবেইরো বলেন, “আমরা এসব ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।”
তিনি আরও বলেন, “পরদিন আমাদের ক্যাথেড্রালে জুবিলি উদ্যাপনের প্রস্তুতি চলছিল। রাত ১০টা ২৫ মিনিটের দিকে মূল ফটকের কাছে বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। নিরাপত্তাকর্মীরা দৌড়ে গিয়ে দেখেন, একটি অল্প ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে।”
ফাদার রিবেইরো বলেন, হামলার পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার আহ্বান জানান।
সেন্ট মেরিজ ক্যাথেড্রালের ফাদার অ্যালবার্ট রোজারিও জানান, ১০ নভেম্বর সকালে আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি. ক্রুজের সভাপতিত্বে গির্জা কর্মকর্তারা বৈঠক করেন এবং নিরাপত্তা জোরদারের সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, “আমরা ক্যাথেড্রালে অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ও একটি আর্চওয়ে গেট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও এক বিবৃতিতে হামলাগুলোর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “এই ঘটনাগুলোকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।”
পুলিশের মুখপাত্র তালেবুর রহমান বলেন, “হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসে স্কুলের ভেতরে বোমা ছুড়ে পালিয়ে যায়।”
সেন্ট যোসেফ স্কুলের অধ্যক্ষ ব্রাদার চান্দন বেনেডিক্ট গোমেজ জানান, ঘটনায় কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি হলেও ক্লাস যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, গত বছরের আন্দোলনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতেই অনুষ্ঠিত হবে। সহিংসতা হলেও তা বিলম্বিত হবে না।
৫ নভেম্বর বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে, যা শুরুর পরপরই সহিংসতায় রূপ নেয়। বিএনপির এক সমাবেশে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, গত বছরের আন্দোলনের সময় লুট হওয়া ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি মেশিনগান, রাইফেল ও পিস্তল ফেরত দিতে যারা আত্মসমর্পণ করবে, তাদের নগদ পুরস্কার দেওয়া হবে।
এসব হামলার পর বাংলাদেশের খ্রিস্টান সমাজে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাদের প্রার্থনা, যেন এমন সহিংসতা আর না ছড়ায় এবং দেশের শান্তি ও সহাবস্থান বজায় থাকে।