মতামত

বিভিন্ন শাসনামলে হত্যাকেন্দ্রিক দমনের ধরন কীভাবে বদলেছে

  • 3:47 pm - November 15, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৭৫ বার
প্রতিকী ছবি

মেলবোর্ন, ১৫ নভেম্বর- বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনা ঘুরছে রাষ্ট্রীয় দমন, হত্যাকেন্দ্রিক দমননীতি এবং ফ্যাসিবাদী আচরণের প্রশ্নে। এই বিতর্কে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হচ্ছে ভিন্নমত দমনে প্রাণঘাতী সহিংসতার ব্যবহার এবং তা কি কেবল একটি বিশেষ সরকারের বৈশিষ্ট্য, নাকি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন শাসনব্যবস্থায় এটি কাঠামোগতভাবে গড়ে উঠেছে। নতুন একটি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত চারটি বড় শাসনচক্রে মব সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং লক্ষ্যভিত্তিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড একটি সুসংগঠিত ধরন তৈরি করেছে, যা সময়ের সঙ্গে বদলে গেলেও মৌলিক কাঠামো একই থেকেছে।

প্রবন্ধটির লেখকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে গভীর রূপ প্রকাশ পায় মানুষকে অমানবিক করে দেখার মধ্য দিয়ে। এর চূড়ান্ত রূপ হলো প্রাণঘাতী সহিংসতা। যেখানে মবের হাতে লিঞ্চিং, নিরাপত্তা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নির্মূল করার প্রবণতা একত্রে কাজ করে। এই কাঠামো ধরতে তিন ধরনের সহিংসতার ওপর ভিত্তি করে একটি যৌগিক সূচক তৈরি করা হয়েছে। সূচকটি প্রতিটি শাসনামলে হত্যার ধরণ কতটা সংগঠিত, অনুমোদিত বা পরিকল্পিত ছিল তা বোঝানোর চেষ্টা করেছে।

বিশ্লেষণে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে চারটি সময়কাল। জিয়াউর রহমানের শাসন (১৯৭৭ থেকে ১৯৮১), বিএনপি সরকারের ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকাল ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত, এবং আগস্ট ২০২৪ থেকে শুরু হওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বছর। প্রতিটি সময়ের জনসংখ্যা হিসাব করে সহিংসতার সংখ্যা প্রতি এক লাখ জনসংখ্যায় রূপান্তর করা হয়েছে যাতে তুলনা স্পষ্ট হয়।

তথ্য নেওয়া হয়েছে অধিকার, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, পূর্ববর্তী গবেষণা এবং সংবাদ তথ্য থেকে। যেখানে তথ্য অসম্পূর্ণ ছিল সেখানে ব্যাক কাস্টিং পদ্ধতিতে সম্ভাব্য সংখ্যা তৈরি করা হয়েছে। লেখকের দাবি, এগুলো বেশ সংযত হিসাব এবং প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মব সহিংসতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, জিয়ার আমলে বছরে গড়ে প্রায় চল্লিশটি হত্যার অনুমান পাওয়া যায়। বিএনপি সময়কালে তা বছরে একশর কাছাকাছি পৌঁছায়। আওয়ামী লীগ আমলে অধিকার ও অন্যান্য সংস্থার তথ্য মিলিয়ে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মোট প্রায় এক হাজার চারশোর বেশি লিঞ্চিংয়ের হিসাব পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর মাত্র এক বছরে ছয়শোর বেশি লিঞ্চিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে জিয়াউর রহমানের সময়। ১৯৭৭ সালের বিদ্রোহের পর সামরিক আদালতের মাধ্যমে এক হাজারের বেশি সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। গবেষকরা এটিকে কার্যত বিচারবহির্ভূত হত্যার সমান মনে করেন। বিএনপি আমলের বড় ঘটনা র‍্যাব গঠনের পর ক্রসফায়ার বৃদ্ধি। ওই সময় মোটামুটি এক হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যার হিসাব গবেষণায় ধরা হয়েছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনে অধিকার প্রায় আড়াই হাজারের বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যার তথ্য দিয়েছে। অন্তর্বর্তী আমলে এই সংখ্যা কম হলেও লক্ষ্যভিত্তিক দমন এবং মব সহিংসতা অন্য মাত্রা তৈরি করেছে।

লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার বিশ্লেষণে একটি ০ থেকে ৩ স্কেল ব্যবহার করা হয়েছে। জিয়া ও বিএনপি আমলকে লেখক পদ্ধতিগত হত্যা প্রবণতার পর্যায়ে রেখেছেন। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, ১৯৭৭ সালের গণ দমন, র‍্যাবের ক্রসফায়ার এবং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এ প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। আওয়ামী লীগ আমলকে সামান্য কম মাত্রায়, কিন্তু নিয়মিত ও বিস্তৃত ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক দমনের জোনে রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টার্গেটেড সহিংসতা প্রকাশ্যভাবে শক্তিশালী এবং প্রাতিষ্ঠানিক এক ধরন নিয়েছে, যা স্কেলে সর্বোচ্চ স্তরে পড়েছে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষণের লক্ষ্য ছিল একটি বিষয় স্পষ্ট করা। বাংলাদেশে হত্যাকেন্দ্রিক দমনের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে, তবে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির শাসনে একই কাঠামোর বিভিন্ন রূপ দেখা গেছে। এক সরকারের পতনে সহিংসতার ধরন কমে আসলেও অন্য সময়ে আবার বাড়তে দেখা গেছে। লেখকের মতে, এটিই দেখায় যে প্রাণঘাতী দমন কেবল একটি দলের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও আধা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে জমে থাকা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বাস্তবতা।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়তে ক্লিক করুনঃ মৃত্যুর রাজনীতি, শাসনভেদে হত্যাকেন্দ্রিক ফ্যাসিবাদের মানচিত্র

 

লেখকঃ প্রফেসর ড. শ্যামল দাস– অধ্যাপক, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও সমাজবিজ্ঞান, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র

এই শাখার আরও খবর

বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে ইহুদিবিদ্বেষের হুমকি অবমূল্যায়িত হয়েছিল: মাইক বার্জেস

সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক…

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au