‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ১৭ নভেম্বর- বাংলাদেশে আজ যে বিচার চলছে, তা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বিরোধের বিচার নয়—এটি ইতিহাসের ওপর অস্ত্র চালানোর বিচার। যে আইনে যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার, আলবদরদের বিচার হয়েছিল, যে আইন তৈরি হয়েছিল পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণ, গ্রামপোড়া ও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতিকার হিসাবে, যে ট্রাইব্যুনাল ছিল ১৯৭১-এর শহীদদের ন্যায়বিচারের প্রতীক, সেই আইন, সেই ট্রাইব্যুনাল আজ ব্যবহার করা হচ্ছে স্বাধীনতার জীবন্ত প্রতীক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।
এটি বিচার নয়—এটি একটি জাতির আত্মাকে টার্গেট করা আইনসজ্জিত আক্রমণ। ICT Act কোনো সাধারণ ফৌজদারি আইন নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে তৈরি সময়সীমাবদ্ধ Tribunal, যা কেবল ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ বিচার করার জন্য জন্মেছিল। এর প্রতিটি ধারা, প্রতিটি উপধারা, প্রতিটি ক্ষমতা ১৯৭১-কে কেন্দ্র করে স্থির করা। আইনটির উদ্দেশ্য, jurisdiction, এবং সংবিধানিক কাঠামো—সবই বলে দেয় যে, শেখ হাসিনা বা কোনো সমসাময়িক নেতার বিরুদ্ধে ICT Act প্রয়োগের কোনো অধিকার কারুর নেই।
তবুও আজ, সেই আইনই টেনে আনা হয়েছে জাতির পিতার কন্যার বিরুদ্ধে, যে জাতির পিতা পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন জীবনের চৌদ্দ বছর; আর নেত্রীর বাবা-মা-ভাইদের হত্যা করেছে মুক্তিযোদ্ধার মুখোশ পরা যুদ্ধাপরাধীরা; এই নেত্রীই সেই লৌহমানবী যিনি ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালে ICT পুনরুজ্জীবিত করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ খুলে দিয়েছিলেন, এবং যিনি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ‘জয় বাংলা’ দর্শনের Physical Embodiment’ও বটে।
এ কারণেই তাঁকে আঘাত করা মানে কেবল একজন নারীকে আঘাত করা নয়;
এটি স্বাধীনতাকে আঘাত করা, বিজয়কে আঘাত করা, ‘জয় বাংলা’কে আঘাত করা, এবং জাতির অস্তিত্বকেই মুছে ফেলার চেষ্টা। আর তাই আজ যে বেআইনি, সাংবিধানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ট্রাইব্যুনালের সামনে একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রনায়ককে দাঁড় করানো হয়েছে—এটি বিচার নয়, এটি প্রতিশোধ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শিক যুদ্ধ।
যারা এই বিচার পরিচালনা করছে—যে বিচারক, যে প্রসিকিউটর, যে আইনজীবী, যে উপদেষ্টা—তারা সকলেই একই আদর্শিক বৃত্তের অংশ। এরা সেই রাজাকার-শিবির দর্শনের উত্তরসূরি, যারা ১৯৭১-এ ‘জয় বাংলা’কে মুছে দিতে চেয়েছিল। পার্থক্য শুধু পরিবেশ ও অস্ত্র: তখন ছিল রাইফেল; আজ আছে আইন, ট্রাইব্যুনাল, এবং দুরভিসন্ধিমূলক ‘legal warfare’।
তাদের উদ্দেশ্য দুটি—
(১) শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক ও শারীরিকভাবে শেষ করা;
(২) এবং তাঁর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতীকটিকেই আইনের ছদ্মবেশে ধ্বংস করা।
কারণ একটি জাতির প্রতীককে ভেঙে ফেললে জাতিটি টিকে থাকে না; আর সেই প্রতীক যদি হয় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জীবন্ত ধারক— তাহলে তাঁকে ভেঙে ফেলা মানে স্বাধীনতার ভিত্তিকাঠ ভেঙে ফেলা।
আজ আমরা তাই একটি বিচারের সামনে নই; আমরা দাঁড়িয়ে আছি একটি জাতিকে তার ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুচিন্তিত অভিযানের সামনে। এ হলো রাজাকার দর্শনের ‘ফাইনাল প্রজেক্ট’—বঙ্গবন্ধুর প্রতিনিধিত্বকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। এ হলো বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারকে শেষ করার ‘আইনি’ ছদ্মবেশ।
কাজেই এ বিচার ICT দিয়ে হয়না, বরং আইনকে ছুরি বানিয়ে প্রতীকের ওপর আঘাত চালানো হয়। এটি আদালতের বিচার নয়—এটি Lawfare: আইনকে অস্ত্র বানিয়ে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার সামরিকীকৃত রাজনৈতিক কৌশল। যে ট্রাইব্যুনালের জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশকে রাজাকারমুক্ত করার জন্য—আজ সেই ট্রাইব্যুনালই ব্যবহার হচ্ছে বাংলাদেশকে রাজাকার দর্শনের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।
এই বিচার তাই কেবল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নয়, এটি ১৯৭১-এর চেতনাকে শেষ করার বিচার,
বঙ্গবন্ধুর ও বাংলাদেশের উত্তরাধিকারকে কাঠগড়ায় তোলার বিচার, এবং স্বাধীনতার প্রতীককে ভেঙে বাংলাদেশের আত্মাকে দুর্বল করার আয়োজন।
আমাদের আজকের আলোচনার মূল থিসিসটি হলোঃ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারটি আইনগতভাবে অবৈধ, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অননুমোদিত, এবং আদর্শগতভাবে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনরুত্থান। যে আদালত, যে আইন এবং যারা বিচার করছে—তারা সবাই পাকিস্তানি-জামায়াত ধারা থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অংশ।
এই প্রবন্ধে আমরা দেখাবো কেন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান বিচার––যার রায় আগামীকাল মানে ১৭ নভেম্বর––বেআইনি, সাংবিধানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য, এবং রাজনৈতিক-আদর্শগত ষড়যন্ত্রের অংশ।
১। ১৯৭৩ সালের আইসিটি এক্ট
১৯৭৩ সালের আইসিটি আইন একটি বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ আইন, যার সময়সীমা (temporal jurisdiction) এবং বিষয়ভিত্তিক ক্ষমতা (subject-matter jurisdiction) অত্যন্ত সীমিত; এটি একমাত্র ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্যই প্রণীত। এই আইন ব্যবহার করে সমসাময়িক রাজনৈতিক নেতাদের—শেখ হাসিনা-সহ—বিচার করা আইনের ধারা ৩ ও ধারা ৫, প্রস্তাবনা (Preamble), এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(১) সরাসরি লঙ্ঘন করে। এর ফলে এটি আইনের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম (jurisdictional overreach) এবং আইনের অপব্যবহার (abuse of law) হিসেবে গণ্য হয়।
একেবারে আইনের পাঠ/ধারা/কাঠামো দেখিয়ে প্রমাণসহ বোঝানো যায় কেন ICT Act (International Crimes (Tribunals) Act, 1973) শেখ হাসিনা বা সমসাময়িক কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি, অসাংবিধানিক এবং আইনি ভাষায় “jurisdictional usurpation.”
নীচে আমি পুরো বিষয়টি একেবারে ধারা–উপধারা ধরে প্রমান করার চেষ্টা করবো ওপরে উল্লিখিত বিষয়টি।
১. ICT Act–এর উদ্দেশ্য (Statement of Objects and Reasons)
ICT Act, 1973–এর মূল উদ্দেশ্য আইনটির শুরুতেই দেওয়া আছে (Preamble + Section 3 এর ব্যাখ্যা):
“To provide for the detention, prosecution and punishment of persons for genocide, crimes against humanity, war crimes, and other crimes under international law, committed in the territory of Bangladesh during the period of Liberation War in 1971.”
এখানে তিনটি তথ্য crystal–clear:
ক) এই আইন অনুযায়ী খুবই বিশেষায়িত অপরাধ এর অধীনে বিচার্য, সাধারণ অপরাধ নয়; দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সাধারন মানবাধিকার লঙ্ঘন এসব ICT’র আওতায় পড়ে না; যদি যুদ্ধকালীন সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় তবে সেটি বিচার্য। ট্রাইবুন্যালের চীফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার কর্তৃক “কৃত” হত্যাগুলো জেনোসাইড নয়। এগুলো যুদ্ধাপরাধও নয়। কাজেই শুরুতেই এই আইনের অধীনে শেখ হাসিনার বিচার হতে পারেনা।
খ) অপরাধের সময়সীমা বাক্য ধরে ধরে নির্ধারিত:
“…committed… during the period of Liberation War in 1971.”
এর মানে ১৯৭১-এর বাইরে কেউ কোনো কারণে যে কোনো পরিস্থিতিতে চরম ভয়াবহ অপরাধ করলেও এই আইনের আওতায় কখনোই তার বিচার হতে পারে না। কাজেই শেখ হাসিনার বিচার এই আইনে অবৈধ।
গ) ICT একটি Special Tribunal যার jurisdiction সময়–নির্দিষ্ট (temporal jurisdiction):
এটি আন্তর্জাতিক আইনেও স্বীকৃত অপরিবর্তনীয় নীতি:
“A war crimes tribunal cannot extend jurisdiction beyond the period for which it is constituted.”
(Source: Rome Statute analogy; ICTY/ICTR jurisprudence)
২) অপরাধ চিহ্নিতকরনঃ ICT Act–এর Jurisdiction
Sections 3 & Section 5
ক) Section 3 (1): Crimes Under Tribunalঃ Tribunal বিচার করতে পারবে—
এগুলোর প্রতিটিই international offences during armed conflict।
কিন্তু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, যেমন রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতি, সিদ্ধান্ত, এসব কোনোভাবেই Section 3(1)-এর সংজ্ঞায় পড়ে না।
খ) Section 5: Punishments
Section 5 স্পষ্ট করে বলে, “শাস্তি দেওয়া যাবে only for crimes defined in Section 3, অর্থাৎ war crimes committed during the war”। তাহলে নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শাসনতান্ত্রিক নীতিমালায় সমস্যার জন্য যে অপরাধ তার শাস্তি আইসিটি এক্ট অনুযায়ী হতে পারেনা। কাজেই ICT আইন Sheikh Hasina বা অন্য নেতাদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না। (আইনি ভাষায়)
৩) জুরিসডিকশানঃ
ICT Act সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে—“1971 Liberation War period।”
বাংলাদেশের যেকোনো আদালত যত বড়ই হোক,
আইনের সময়সীমা ভেঙে jurisdiction বাড়াতে পারে না।
→ Ultra vires (বিধির বাইরে ক্ষমতা প্রয়োগ)
ICT Act-এর অপরাধগুলো:
এসবের একটিও Sheikh Hasina-এর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগে নেই। আইনের ক্ষেত্রে বলা যায়, Not the right court, not the right crime.
ICT Act Section 3 অনুযায়ী Tribunal বিচার করবে—
Sheikh Hasina:
কাজেই, ট্রাইবুন্যালের “ZERO personal jurisdiction” আছে এখানে।
আইনে যে বিষয়গুলো ১৯৭১ বছরে সংজ্ঞায়িত ছিল না, ICT তা criminalize করতে পারে না।
Article 35(1) বলে—
“No person shall be convicted of any offence which was not an offence at the time of its commission.”
কাজেই যা Hasina-এর বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে, যেমন State policy, governance decision
এগুলো ১৯৭১ এর অপরাধ লিষ্টে ছিল না। সময়ের বাইরে অপরাধ সংগঠনের দাবী অসাংবিধানিক।
একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালকে তার “objective clause” ছাড়া ব্যবহার করা যায় না। ICT-এর objective clause: “war crimes committed in 1971 during liberation war.” কোর্ট/ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্য কখনো বদলানো যায় না। এটি jurisprudence এর iron rule: “Special tribunals cannot be repurposed.” বাংলাদেশের Supreme Court এ doctrine বহুবার দেখিয়েছে (8th Amendment Case; 5th Amendment Case)।
৪) আন্তর্জাতিক তুলনা: ICTY, ICTR, ICC—সবই সময়/ক্ষেত্র নির্দিষ্ট
ICTY (Yugoslavia Tribunal)
→ only crimes during Balkan war
→ not usable for domestic political issues
ICTR (Rwanda Tribunal)
→ only crimes during 1994 genocide
→ not for corruption/policy/governance
Nuremberg Tribunal
→ only crimes committed during WW2
→ could not be applied to post-war political leaders
বাংলাদেশের ICT = বিশ্বমানের war crimes tribunal model.
আইসিটি’র অধীনে শেখ হাসিনার বিচার = অভূতপূর্ব/ বেআইনি / অসম্ভব.
৫. বিচারটি কেন বেআইনি বা অনৈতিকঃ সংবিধানগত ও আইনি যুক্তি
৫.১. ‘Competent Court’ নয়:
বাংলাদেশ সংবিধানের Article 35(3) অনুসারে,
“No person shall be tried except by a court of law established by law.”
কিন্তু এখনকার যে আদালত/ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে বিচার করছে—
→ অর্থাৎ, এটি ‘court of law’ নয়, বরং ‘executive tribunal’।
এটি পাকিস্তান আমলের Frontier Crimes Regulation (FCR) এবং Ayub’s EBDO tribunals–এর সাথে কাঠামোগতভাবে একই।
৫.২. Retrospective Criminal Liability (Ex-Post Facto Punishment)
সংবিধানের Article 35(1)
“No person shall be convicted for an act which was not an offence at the time it was committed.”
বর্তমান অভিযোগগুলো:
এগুলোকে এখন অপরাধ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এগুলো সরাসরি ex-post facto মামলার উদাহরণ — যা সংবিধান লঙ্ঘন।
৬। যেখানে বিচার হচ্ছে, সেই ট্রাইবুন্যাল কেন বেআইনি বা অনৈতিক?
গঠন ও কাঠামোঃ
এই বেআইনি ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে জড়িত বহু আইনজীবী ও বিচারকের অতীত রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কেউ ২০০১–২০০৬ সালে প্রকাশ্যে জামায়াত–শিবির–ঘনিষ্ঠ প্যানেলের অংশ ছিলেন; কেউ ICT–এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্যাম্পেইন চালিয়েছেন; কেউ আবার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গুলাম আজম, মতিুর রহমান নিজামী প্রমুখের ডিফেন্স টিমে ছিলেন। এই ধারাবাহিকতাকে অনেকে ‘রাজাকার পুনর্বাসন নেটওয়ার্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সে প্রেক্ষিতে আজ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের পরিচালিত বিচারকে স্বাধীনতার বিপরীত শিবিরের একটি আইনি অভিযাত্রা বলেই মনে হয়।
এটি Gramsci’র ভাষায় “judicial hegemony capture”; এই প্রক্রিয়ায় ব রর্তমান কুশীলবেরা এমনভাবে বিচারবিভাগকে কুক্ষীগত করে যে, তাদের আদর্শ ও মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করা হয় যেন বিরুদ্ধ মত ও পথের ধ্বংসপ্রাপ্তি ঘটে; কাজেই এটি অনৈতিক।
৭। যে আইনে বিচার চলছে—তা নিজেই বেআইনি
৭.১. বর্তমান আইনটি পাশ ও প্রয়োগ করা হয়েছে একটি অনির্বাচিত সরকারের দ্বারা।
এটি অন্তর্বর্তী সরকারের আইন যাঃ
→কাজেই যেকোন অনির্বাচিত সরকার কর্তৃক প্রনীত আইনের বৈধতা সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত নয়; সেকারনে এ জাতীয় আইন অবৈধ।
৭.২. এই আইন “আইনী কাঠামোর মৌলিক ডক্ট্রিনকে” অস্বীকার করেঃ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অষ্টম সংশোধনী বিষয়ক রায়ে (১৯৮৯) কোর্ট উল্লেখ করেন, “Parliament or any authority cannot alter the basic structure of the Constitution”.
কিন্তু এই নতুন বিশেষ আইন এটি মানেনি। কারনগুলো দেখা যাক।
৭.২.১। বিচারিক স্বাধীনতা খর্ব হয়েছেঃ
বিচারক নিয়োগ দিয়েছে নির্বাহী বিভাগ (Interim Govt) , আইন বিভাগ নয় (Judiciary) নয়। বাংলাদেশ সংবিধানের আরটিক্যাল ২২ বলছে: “The State shall ensure the separation of the judiciary from the executive.”
কিন্তু আলোচ্য আইনটির ক্ষেত্রে করা বিশেষ আইন (special tribunal act) অনুযায়ী নীচের বিষয়গুলো প্রনিধানযোগ্যঃ
➡ এটি আইন বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করে।
➡ তাই আইনটি সাংবিধানিকভাবে অবৈধ।
৭.২.২ আইনটি মৌলিক অধিকার স্থগিত করেছে
যেসব অধিকার সংবিধান নিশ্চিত করেছে এটির তৃতীয় অংশে সেগুলো হলো (Part III):
এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ; যে কেউ High Court–এ রিট করতে পারে যদি তার Fundamental Right লঙ্ঘন হয়।
সংবিধানের তৃতীয় অংশ (Part III) = মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) + বস্তুনিষ্ঠ বিচার (Fair Trial) + যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process) + মানবিক মর্যাদা (Human Dignity)
নতুন বিশেষ আইনে নীচের জিনিসগুলো করা হয়েছেঃ
(১) হাইকোর্টের রিট/বিচার পর্যালোচনার ক্ষমতা স্থগিত;
(২) অভিযুক্তের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ নেই;
(৩) ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক আপিলের সুযোগ নেই;
(৪) গ্রেপ্তার/জামিন/হাজিরার স্ট্যান্ডার্ড সেফগার্ড নেই;
(৫) পাবলিক হিয়ারিং অধিকার সীমিত।
এগুলো সংবিধানের তৃতীয় অংশের সাথে সাংঘর্ষিক, এবং আদালতের ভাষায়: Any law that suspends or restricts fundamental rights is void under Article 26(1).
অতএব, এ আইনটি ultra-vires বা সংবিধানবহির্ভূত।
৭.২.৩ নতুন আইনে ডিউ প্রসেস বাদ পড়েছেঃ কিভাবে?
Due process মানে:
✔ proper notice
✔ right to counsel
✔ open trial
✔ right to present evidence
✔ right to cross-examine witnesses
✔ appeal to higher court
✔ independence of court
✔ equality before law
✔ neutrality of forum
✔ burden of proof beyond reasonable doubt
কিন্তু নতুন বিশেষ আইনে দেখা যাচ্ছে:
(ক) দ্রুত বিচার (summary trial) স্টাইলের প্রক্রিয়া
(খ) সাক্ষী জেরা সীমিত
(গ) evidence discovery সীমিত
(ঘ) detention–এর জন্য soft standards
(ঙ) tribunal-এর ওপর executive control
(চ) appeal/HC review সীমাবদ্ধ
(ছ) accused-এর defence preparation–এ সময় সীমিত
(জ) Public trial নয় (military-controlled venue)
এগুলো Classical due process (Article 31 + Article 35) ভেঙে দেয়।
বাংলাদেশের Supreme Court বহু রায়ে বলেছে: “Due process is part of the basic structure of the Constitution.” (8th Amendment Case, 1989)
যে আইন due process ভেঙে দেয় সে আইন শুরু থেকেই void ab initio বা শুরু থেকেই বাতিল।
এটিকে আইনের ভাষায় বলে, Ultra-Vires. অর্থাৎ
সেক্ষেত্রে সেই আইন বা সেই কাজ আইনত শূন্য (void) বলে গণ্য হয়। এটিকে ultra-vires এর অধীনে ফেলা যায়।
আইনগতভাবে যে আইনকে ultra-vires বলা হয় সেটি নিচের যে কোনটি হতে পারেঃ
(ক) সে আইন অকার্যকর
(খ) সে আইনে করা কাজ বাতিলযোগ্য
(গ) সে আইনে পরিচালিত বিচার অবৈধ
(ঘ) সেই আইন “জন্ম থেকেই বেআইনি” অর্থাৎ void ab initio;
অন্য কথায়, আইনই যদি অবৈধ হয়, সেই আইনে চলা বিচারও অবৈধ।
৮। বিচারক ও আইনজীবীদের আদর্শগত পক্ষপাত — “Pro-Razakar Jurisprudence”
বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখা যাক।
২০০১–২০০৬ সময়ে আইনজীবী সমিতিগুলোর ৭৫%+ নিয়ন্ত্রণ ছিল জামাতে ইসলামী বা তাদের দ্বারা সমর্থিত প্যানেলের হাতে। এসব আইনজীবীদের একটি বড় অংশ এখন বিচারক, প্রসিকিউটর, ট্রাইব্যুনাল সদস্য।
প্রামানিক তথ্যে দেখা যায়, এই বিচারকেরা নীচের বিষয়গুলোর সাথে জড়িতঃ
এখন তারাই শেখ হাসিনার বিচার পরিচালনা করছে। এখানে আদর্শগত অবস্থান আইনী ডক্ট্রিনের সাথে সাংঘর্ষিক। খুব পরিষ্কার বোঝা যায়, পাকিস্তানি-জামায়াত আদর্শে বিশ্বাসী গোষ্ঠী আজ বিচারিক ক্ষমতা দখল করেছে।
উপসংহার: আইনি ছুরির নিচে দাঁড়ানো একটি স্বাধীন জাতি
১৯৭৩ সালের আইসিটি আইন শুধু একটি ফৌজদারি আইন নয়, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি আইনি স্মৃতিস্তম্ভ—একটি ন্যায়বিচারের স্মারক, যা স্থাপন করা হয়েছিল ১৯৭১-এর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার জন্য। সেই বিশেষ আইনকেই আজ উল্টে ব্যবহার করা হচ্ছে সেই নেত্রীর বিরুদ্ধে, যিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। এই একটিমাত্র তথ্যই আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট প্রশ্ন তুলে ধরে: আইন কি আজ ন্যায়বিচারের হাতিয়ার, নাকি প্রতিশোধের অস্ত্র?
এই প্রবন্ধে আমরা দেখলাম—আইনের পাঠ, ধারা, উদ্দেশ্য এবং সংবিধানিক কাঠামো—সবকিছুই একসাথে দাঁড়িয়ে আছে শেখ হাসিনার পক্ষে, এবং এই বেআইনি ট্রাইব্যুনালের বিপক্ষে। ICT Act-এর সময়সীমা (শুধু ১৯৭১), বিষয়ভিত্তিক ক্ষমতা (war crimes, genocide ইত্যাদি), এবং ব্যক্তিভিত্তিক jurisdiction (দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী)–এর কোনো স্তরেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এই আইনের প্রয়োগ সম্ভব নয়। সুতরাং এই বিচারের জন্মই হয়েছে একটি আইনি মিথ্যার ভিতে দাঁড়িয়ে—আইন এখানে বিচারক নয়, বরং আসামি; আর ট্রাইব্যুনাল নিজেই তার jurisdiction-এর dock-এ দাঁড়িয়ে।
এখানে শুধু আইসিটি আইনই ভাঙা হয়নি; ভাঙা হয়েছে সংবিধানের তৃতীয় অংশে গ্যারান্টিকৃত মৌলিক অধিকার, ভাঙা হয়েছে ন্যায্য বিচার (fair trial) ও due process-এর ন্যূনতম মান। একটি অনির্বাচিত, অসাংবিধানিক সরকারের অধীনে, নির্বাহী বিভাগের আদেশে গঠিত ট্রাইব্যুনাল; বিচারকেরা রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত প্রো–রাজাকার নেটওয়ার্ক থেকে উঠে আসা; হাইকোর্টের রিভিউ ও মৌলিক অধিকার প্রয়োগের পথ প্রায় বন্ধ—এসব মিলিয়ে এই বিচারকে “court of law” বলা যায় না; এটি একটি executive theatre, যেখানে নাটকের নাম “বিচার”, কিন্তু স্ক্রিপ্ট লেখা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশোধ আর আদর্শিক বদলির নকশা থেকে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক সত্য হলো—যে শক্তিগুলো ১৯৭১-এ ‘জয় বাংলা’ রাষ্ট্রদর্শনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, যারা ICT–এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া পর্যায়ে প্রচার চালিয়েছিল, যারা যুদ্ধাপরাধীদের ডিফেন্স প্যানেলে থেকে তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল—আজ সেই ধারাবাহিকতারই উত্তরসূরি একদল আইনজীবী ও বিচারক শেখ হাসিনার বিচার পরিচালনা করছে। এখানে আর শুধু প্রযুক্তিগত আইনি ত্রুটি বা অসাবধানতা নেই; এখানে আছে Pro-Razakar Jurisprudence—একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শিক বিচারদর্শন, যা মুক্তিযুদ্ধের আইনকে ব্যবহার করছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতীককে ভাঙার জন্য।
ফলে এই বিচার কেবল একজন নেত্রীর বিরুদ্ধে নয়; এটি বাংলাদেশের ১৯৭১–পরবর্তী রাষ্ট্রদর্শনের বিরুদ্ধে; এটি “জয় বাংলা”–কেন্দ্রিক সাংবিধানিক চেতনার বিরুদ্ধে; এটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জীবন্ত বহনকারী শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দিয়ে, পাকিস্তানি-জামায়াত ভাবধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক আইনি প্রকল্প।
আইনের ভাষায় এই বিচার ultra-vires—সংবিধানবহির্ভূত, উদ্দেশ্যবহির্ভূত, এবং jurisdiction-বহির্ভূত; আর রাজনীতির ভাষায় এটি একটি lawfare project—আইনকে সামরিক কৌশলের মতো ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ ও প্রতীককে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া। ইতিহাসের ভাষায় এটি আরেকটি “মীরজাফর মুহূর্ত”—যেখানে বাহ্যিক কলম, গাউন ও আদালতের পাটাতন দিয়ে আসলে ভেতরে ভেতরে একটি জাতির আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয়কে নষ্ট করার যুগান্তকারী ষড়যন্ত্র চলছে।
প্রশ্ন হলো, আমরা এই (অ)বিচারযজ্ঞকে কী নামে ডাকব? একটি বৈধ আদালতের রায় হিসেবে, নাকি একটি অবৈধ ক্ষমতার আইনি প্রহসন হিসেবে?
বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, তাদের সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব দাঁড়িয়ে গেছে; সেটি এইঃ এই বিচারকে কেবল রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে নয়, সংবিধান ও স্বাধীনতার বাঁচা-মরার ইস্যু হিসেবে দেখা। আইনের অপব্যবহারকে চিহ্নিত করা, Pro-Razakar বিচারদর্শনকে উন্মোচিত করা, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লিখে রাখা যে, যে আইনে রাজাকারদের বিচার হয়েছিল, সেই আইনে শেখ হাসিনার বিচার কেবল বেআইনি নয়; এটি স্বাধীনতার প্রতীককে ভাঙার শেষ প্রচেষ্টা।
ইতিহাস শেষ কথা বলবে, কিন্তু আমাদের দায়িত্ব, আজকের দিনে অন্তত এতটা পরিষ্কার করে বলা:
এই বিচার আইনের বিচারের মানদণ্ডেও টেকে না, মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক মানদণ্ডেও টেকে না, আর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের আদর্শিক মানদণ্ডেও টেকে না। যে শরীরে স্বাধীনতা বেঁচে আছে, সেই শরীরে আঘাত মানে শুধু একজন মানুষকে আঘাত করা নয়; সে আঘাত বাংলাদেশের উপর, আমাদের জনগণের ইতিহাসের উপর, আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের উপর। এই আঘাত আমরা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নথিভুক্ত করব— একটি বেআইনি (অ)বিচারযজ্ঞ হিসেবে, যার বিরুদ্ধে জনগণের বিচারই হবে শেষ বিচার।
লেখকঃ প্রফেসর ড. শ্যামল দাস– অধ্যাপক, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও সমাজবিজ্ঞান, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au