হামের লক্ষণ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জনের মৃত্যু ও নতুন রোগী শনাক্ত বৃদ্ধি
মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- দেশে হাম ও হাম-সদৃশ লক্ষণ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সময়ে নতুন রোগী শনাক্ত…
মেলবোর্ন, ২৪ নভেম্বর- অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। এতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ছিলেন পুরো হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। আর সাবেক পরিদর্শক লিয়াকত আলী পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সিনহাকে হত্যা করতে পরপর চারটি গুলি করেন। গুলিগুলো তাঁর শরীরের ঊর্ধ্বাংশে লাগে এবং সেগুলোর আঘাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
৩৭৮ পৃষ্ঠার রায়টি আজ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। রায় লিখেছেন বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমান। বেঞ্চের আরেক সদস্য বিচারপতি সগীর হোসেন এতে একমত হন। এর আগে ২ জুন হাইকোর্ট প্রদীপ ও লিয়াকতের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেন।

মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। ছবিঃ সংগৃহীত
হত্যার পরিকল্পনার পেছনের কারণ ও প্রস্তুতি
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত দেখিয়েছেন হত্যার পরিকল্পনা কীভাবে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে।
২০২০ সালের জুলাই মাসে সিনহা তাঁর দুজন সহকর্মীকে নিয়ে ইউটিউবভিত্তিক ডকুমেন্টারি প্রকল্পের জন্য কক্সবাজারে আসেন। নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করে তাঁরা টেকনাফ, রামু ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভিডিও তৈরি করছিলেন। এই সময়ে তাঁরা স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ ও তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, গুম, ক্রসফায়ারসহ নানা অভিযোগ সংগ্রহ করতে থাকেন এবং সেই বক্তব্য ভিডিও করেন।
রায়ে বলা হয়, এই তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি প্রদীপ দ্রুত জানতে পারেন। এরপর তিনি সিনহাকে বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দেন। স্থানীয় সোর্সদের পাঠিয়ে সিনহাকে এলাকা ছাড়তে বলেন। কিন্তু সিনহা কাজ চালিয়ে যান।
হাইকোর্ট বলেন, এই জায়গা থেকেই হত্যার পরিকল্পনা শুরু হয়। প্রদীপ তাঁর ঘনিষ্ঠজন লিয়াকত, নন্দদুলাল রক্ষিত, সাগর দেব, রুবেল শর্মা ও তিন সোর্স (নুরুল আমিন, আইয়াজ, নিজাম উদ্দিন)কে নিয়ে সিনহার ওপর নজরদারির দায়িত্ব দেন। তারা সিনহা কোন পাহাড়ে যাচ্ছেন, কখন ফিরছেন, কার সঙ্গে আছেন, এসব তথ্য প্রদীপকে দিতেন।
মাইকিং করে ‘ডাকাত’ বানানোর পরিকল্পনা
সিনহা ও তাঁর সহকর্মী সায়েদুল ইসলাম মারিশবুনিয়া এলাকায় ভিডিও ধারণ শেষে ফেরার পথে পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ঘোষণা দেওয়া হয় যে পাহাড়ে ডাকাত এসেছে। আদালত বলছে, এই মাইকিং ছিল গণপিটুনির পরিবেশ তৈরি করার কৌশল।
সোর্স নিজাম উদ্দিন তদন্তে স্বীকার করেন, তিনি প্রদীপের নির্দেশে মাইকিং করেন। মাইকিংয়ের উদ্দেশ্য ছিল গণমানুষকে উত্তেজিত করে সিনহা ও সায়েদুলকে ঘিরে ফেলা, যাতে তাদের ডাকাত হিসেবে চিহ্নিত করা যায় এবং হত্যার পর ঘটনাকে আত্মরক্ষামূলক বলে চালানো যায়।
ঘটনাস্থলে প্রদীপের উপস্থিতি ও ভূমিকা
রায়ে বলা হয়, প্রদীপ পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের মুহূর্তে ঘটনাস্থলের খুব কাছেই অবস্থান করছিলেন। লিয়াকতের গুলির পর তিনি ঘটনাস্থলে এসে সিনহার বুকের বাম পাশে জুতা পরা পা দিয়ে জোরে চাপ দেন এবং বুকের হাড় ভেঙে দেন।
পরে তিনি গলার বাম পাশে পা দিয়ে চেপে ধরেন, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় সিনহা মারা গেছেন। এটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে মিল রয়েছে, যেখানে বুকের দুই হাড় ভাঙা এবং গলার চাপে আঘাতের কথা বলা হয়েছে।
রায়ে বলা হয়, সিনহা পড়ে যাওয়ার পর প্রদীপ ও অন্যরা তাঁর ব্যাকপ্যাক, ড্রোনসহ বিভিন্ন জিনিস তল্লাশি করে এবং ঘটনাটিকে “আত্মরক্ষার্থে গুলি” বলে প্রচার করতে ব্যবহারের চেষ্টা করে।
লিয়াকতের চার গুলির বিশদ বিবরণ
লিয়াকত আলীর ভূমিকার বিষয়ে রায়ে বলা হয়, তিনি ছিলেন সরাসরি হত্যাকারী। তিনি সরকারি পিস্তল ব্যবহার করেন এবং তাঁর গুলিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ঊর্ধ্বাংশে নিক্ষেপ করেন।
রায় অনুযায়ী, গুলিগুলোর অবস্থান ও দাগ দেখে বোঝা গেছে যে লিয়াকত সিনহাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই গুলি করেছেন। গবেষণাগারে পাঠানো ব্যালিস্টিক রিপোর্ট, সাক্ষীদের বয়ান ও ময়নাতদন্ত সবই একই কথা বলেছে।
ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছয় আসামির ভূমিকা
নন্দদুলাল রক্ষিত, রুবেল শর্মা, সাগর দেব, নুরুল আমিন, আইয়াজ ও নিজাম উদ্দিনকে হাইকোর্ট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখেছে।
রায়ে বলা হয়, তারা হত্যার পরিকল্পনা, নজরদারি, মিথ্যা ডাকাতির অভিযোগ ছড়ানো, মাইকিং এবং ঘটনাস্থলে সহায়তা—এসবের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যদিও তারা সরাসরি গুলি চালাননি, তাদের কর্মকাণ্ড পুরো হত্যাকাণ্ড সফল করতে সহায়তা করেছে।
যে কারণে মৃত্যুদণ্ড বহাল
হাইকোর্ট রায়ে বলেন,
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে শামলাপুর চেকপোস্টে লিয়াকতের গুলিতে নিহত হন সিনহা। পরে বিচারিক আদালত আটজনকে সাজা দেন।
ডেথ রেফারেন্স, আপিল, রিভিশন সব শুনানি শেষে গত ২ জুন রায় দেওয়া হয়। আজ প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে হত্যার পেছনের পুরো পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, ষড়যন্ত্র ও প্রমাণগুলো বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au