‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ২৭ নভেম্বর- আজকাল ঢাকার আকাশে ধোঁয়া উঠলে সবাই ভাবে- আরেকটা বস্তিতে আগুন লেগেছে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিস ছুটে যায়, মানুষ ছোটাছুটি করে, টিনের ঘর মুহূর্তে ভস্মীভূত হয়।
কিন্তু আগুন নিভে গেলে যে প্রশ্নটা বারবার ফিরে আসে, তা হলো, এই আগুন কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিতভাবে লাগানো? কখনো কখনো আগুনের ধোঁয়ার চেয়েও ঘন হয়ে ওঠে সন্দেহ- এই আগুন কি কারও স্বার্থরক্ষার সহজতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে?
গত ১০–১৫ বছরেই ঢাকার কড়াইল, মিরপুর, মহাখালী, তেজগাঁও, বনানী এবং আরও বহু বস্তিতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কয়েকশ ঘর, আবার কোথাও কয়েক হাজার ঘর এক রাতেই ছাই হয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিস ও কিছু গবেষণা বলছে, ঢাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে বছরে চার-পাঁচ ডজন অগ্নিকাণ্ড নথিবদ্ধ হয়। এই সংখ্যা শুধু দুর্ঘটনার সম্ভাবনাই নয়, বরং একটি নিয়মিত সংকটকেই সামনে আনে।
ঢাকায় সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিকেলে কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মহাখালী-গুলশানের মাঝখানে প্রায় ৯০ একর এলাকাজুড়ে কড়াইল বস্তি। যেখানে বাস করেন প্রায় এক লাখ মানুষ। রাজধানীর বুকে এ ধরনের ঘনবসতিপূর্ণ জনপদে কয়েক হাজার পরিবারের জীবিকা চলে দিনমজুরি, রিকশা চালানো, ছোট ব্যবসা, ভাঙারি বা গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করার মাধ্যমে। কর্মজীবী পরিবারের অধিকাংশ নারীও ছোট দোকানে, গার্মেন্টসে বা বাসাবাড়িতে শ্রম দেন।
এই জনপদে আগুন লেগে যাওয়া নতুন কিছু নয়। বরং প্রায়ই বছরের দুই-তিনবার আগুন লাগে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। তাদের প্রশ্ন- এসব আগুন কি সত্যিই দুর্ঘটনা, নাকি কারও নাশকতার ফল? ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই, সম্পদ হারিয়ে মানুষ পথে বসে যায়। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত এগোয় না। বস্তির মানুষ নিঃস্ব হলে কারো কি আসে- যায়?
এক গবেষণা (এক্সপ্লোরেটরি স্টাডি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ঢাকার অনানুষ্ঠানিক বসতি গুলোতে বছরে গড়ে প্রায় ৪৭বার আগুন লাগে বলে। ২০২০ সালে ঢাকায় ৩১টি অগ্নিকাণ্ডের হিসাব পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ঘনবসতি নগরগুলোর মধ্যে- কড়ারাইল, হাজারিবাগ, মিরপুর, মহাখালী, তেজগাঁও, বনানী গোডাউন এলাকার বস্তি বারবার অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বহুল আলোচিত; ২০১৯ সালে মিরপুরের অগ্নিকাণ্ডে কয়েক হাজার ঘর পুড়ে যাওয়ার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও উঠে আসে। ২০২৪ সালের মে মাসেও কড়াইল বস্তিতে আগুন লেগে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়েছিল।
বস্তিতে আগুন- দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত?
বস্তিতে আগুন নিছক দুর্ঘটনা এমন উদাহরণ অবশ্যই আছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাও হলো, বারবার একই ধাঁচের আগুন, একই ধরনের তদন্ত-অস্বচ্ছতা, আগুনের পর জমি নিয়ে টানাপড়েন। এসবকিছু মিলিয়ে ‘বস্তিতে আগুন লাগে নাকি কেউ আগুন লাগায়’ এই প্রশ্নকে অযৌক্তিকও বলা যায় না।
শহর উন্নয়নের নামে বা বাণিজ্যিক স্বার্থে যদি গরিব মানুষের ঘর পোড়ানোই সহজতম উপায় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, এটা গভীর সামাজিক অন্যায়ও। আর এই কারণেই প্রশ্নটি আমাদের বারবার করতে হবে- আগুন কি সত্যিই নিছক আগুন? নাকি আমাদের নগর-বাস্তবতার ভিতর লুকিয়ে থাকা কোনো বড় অসমতার প্রকাশ?
আগুনের কারণ হিসেবে বেশির ভাগ সময় বলা হয়, শর্টসার্কিট, গ্যাস লিকেজ বা অসাবধানতাবশত চুলা থেকে আগুন ছড়ানো। এটা সত্য যে বস্তিগুলোতে বিদ্যুতের দুর্বল লাইন, রান্নাঘর ছোট, জায়গা ঘিঞ্জি, আর নিরাপত্তা মানদণ্ডও প্রায় অনুপস্থিত। কিন্তু একইসঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সেটি হলো বস্তির অবস্থান এবং জমির বাজারমূল্য। ঢাকার অনেক বস্তিই এমন জায়গায়, যেখানে প্লটের দাম কোটি টাকার উপরে। যেসব জায়গায় বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক প্রকল্প বা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির আগ্রহ আছে, সেসব জায়গায় বস্তি-আগুন রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে। কারণ, বহু ঘটনায় দেখা গেছে আগুনের পরপরই কেউ না কেউ উঠে আসে জমি ‘খালি’ করার উদ্যোগ নিয়ে। কোথাও কোথাও বস্তিবাসীদের ফিরে যেতে বাধা দেওয়া হয়, আবার কোথাও ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের ঘোষণা আসে। আগুন লাগার পরপরই জমি দখল ও উন্নয়ন অবকাঠামোর এমন অনেক অভিযোগ স্থানীয় মানুষ, এনজিও কর্মী ও সাংবাদিকেরা বহু বছর ধরে তুলছেন। কিন্তু শুনবার কান কী কারও আছে?
তদন্ত কমিটি কাগজে আছে, ফলে নেই
বস্তিতে আগুন সাধারণত দুর্ঘটনা, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আগুনের প্রকৃত কারণ উদঘাটন না হলে, এবং আগুনের পরে জবাবদিহিতা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত না হলে- বসতি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে। আগুন লাগার পর সরকারি বা বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও কখনও-কখনও বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধিরাও থাকেন। তবে পথ চলার পর দেখা যায়, রিপোর্ট তৈরি হয়, সুপারিশ থাকে; কিন্তু রিপোর্ট সার্বজনীনভাবে প্রকাশের অভাব, বাস্তবায়নের অনিয়মিততা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে বিচারহীনতা সাধারণ দৃশ্য। অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে ছোটোখাটো রিপোর্ট মারফত কমিটির গঠন লেখালেখি হলেও অন্তিম প্রতিবেদন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গঠনমূলক ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। এটি শুধু কাগজে ‘তদন্ত করা হয়েছে’ এমন একটি ব্যয়বহুল রুটিনে পরিণত হয়েছে বলে বিরূপ মন্তব্যও আছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর বস্তিবাসীরা প্রায়ই বলেন, ‘রিপোর্টটা কোথায় গেল, কেউ জানে না।’ আগুনের কারণ জানতে চাওয়া নাগরিক সমাজ বা সংবাদমাধ্যমও অনেক সময় স্পষ্ট উত্তর পায় না।
আগুন নিভে গেলে জমি কার হয়?
বস্তির আগুন শুধু ঘর পোড়ায় না, ঘর হারানো মানুষের ওপর আরেক দফা জমি হারানোর মানসিক চাপ তৈরি হয়। অগ্নিকাণ্ডের পরে অল্প কিছু মানুষই ঘরবাড়িতে ফিরিয়ে নিতে পারে। ইতিহাস বলে কড়াইলের মতো বস্তির ক্ষেত্রে আগুন ও উচ্ছেদের পরে জমি দখল, কার্যকর নির্বাসনের প্রচেষ্টা এবং সরকারি পদক্ষেপের মিলিয়ে সংঘর্ষের অনেক ঘটনা দেখা গেছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বস্তিবাসীরা আগুনের ক্ষয়ক্ষতি সামলে নতুন করে ঘর বানাতে গেলে নানাভাবে বাধা আসে। কেউ এসে বলে জমি তাদের, কেউ বলে সরকারি উন্নয়ন হবে, কেউ আবার রাতারাতি সীমানা টেনে দেন। আগুনের ধাক্কায় গৃহহারা মানুষের দুর্বলতা প্রভাবশালীদের জন্য হয়ে ওঠে নতুন সুযোগ। এক রাতের ভস্মীভূত বস্তিতে কয়েক সপ্তাহের ভেতরই নতুন অট্টালিকা নির্মাণের উদ্যোগ দেখা যায়, কখনো কখনো নিরাপত্তার অজুহাতে উচ্ছেদের প্রহসন শুরু হয়। এইসব নজির থেকে বোঝা যায় যে, আগুন কখনও-কখনও স্থানীয় বস্তিবাসীর ওপর আঘাত করে, কিন্তু পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও পুনর্বাসনহীনতা তাদের আরও দুর্বল করে তোলে।
প্রশ্ন হলো, এত মানুষের বসবাস যেখানে, সেখানে বারবার অগ্নিকাণ্ড ঘটলে কেন প্রতিবারই আমরা ‘দুর্ঘটনা’ বলে দায় এড়িয়ে যাই? কেন তদন্তের ফলাফল সামনে আসে না? ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মতে, ‘কড়াইল বস্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা স্বার্থগোষ্ঠীর টানাপড়েন রয়েছে। জমি দখল, প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ বহু বিষয়। গত ৫ আগস্টের আগে যে গ্রুপ ছিল, এখন সেখানে অন্য গ্রুপের দাপট-।এমন বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’
যেসব তথ্য থাকা উচিত, কিন্তু থাকে না
রাজধানীর মাঝখানে এত বড় একটি বস্তি বারবার পুড়ে গেলে তার দায় শুধু বাসিন্দাদের নয়; সরকারের সংস্থাগুলোরও জবাবদিহি থাকা উচিত। তবে বাংলাদেশের নগর গবেষক, পরিবেশবিদ, এনজিও ও সাংবাদিকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় মানবিক বিপর্যয়ের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্যভান্ডার থাকা জরুরি। যেমন: বছরে কতটি বস্তিতে আগুন লাগল, অফিসিয়াল তদন্তের অগ্রগতি, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সঠিক তালিকা, জমির মালিকানা আগে ও পরে, বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের অবস্থা। এসব তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হলে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা মিলত- এক, আগুনের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত হতো; দুই, আগুন পরবর্তী দুর্বৃত্ত দখল বা উচ্ছেদ প্রতিরোধ হতো। কিন্তু এসবের কিছুই কেউ করে না। না সরকারি দপ্তর, না উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছে এসবের নথিপত্র থাকে। প্রতিবার অগ্নিকাণ্ডের পর সবাই নড়েচড়ে বসলেও সপ্তাহ গড়াতে নতুন ইস্যুতে সবাই ডুবে যায়। তাইতো বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। ফলে সন্দেহ, গুজব ও অভিযোগই জায়গা দখল করে নেয়।
কী করা জরুরি
এই সংকট থেকে বের হতে হলে- তদন্তের স্বচ্ছতা আনতে হবে। প্রতিটি বড় আগুনের তদন্ত রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়াও শুধু প্রশাসনিক তদন্ত দিয়ে নয়; বৈজ্ঞানিকভাবে কারণ নির্ধারণে স্বাধীন ফরেনসিক টিম গঠন করতে হবে। সেই সাথে আগুন পরবর্তী জমি সুরক্ষা এবং আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে এলাকা দখল প্রতিরোধে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সঠিক অবকাঠামো গড়ে না তুললে কড়াইলের মানুষ বারবারই আগুনে সব হারাবে, আর আমরা প্রতিবারই একই প্রশ্ন তুলব- আগুনটি কি লেগেছিল, নাকি লাগানো হয়েছিল?
লেখকঃ মায়া রাজবংশী, কবি ও প্রাবন্ধিক
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au