মেলবোর্ন, ২৮ নভেম্বর- নভেম্বরজুড়ে দেশে একের পর এক ভূমিকম্প ও আফটারশক অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, গ্যাস উত্তোলন বা গোপনে পরিচালিত কোনো ফ্র্যাকিং কার্যক্রম কি এ কম্পনের কারণ? বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন বলছে, এর পেছনে মানবসৃষ্ট কারণ নয়, বরং বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন ও টেকটোনিক চাপই দায়ী।
সাম্প্রতিক গবেষণা ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বড় পরিসরে শেল গ্যাস ফ্র্যাকিং চলছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। পেট্রোবাংলার বার্ষিক প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রে প্রচলিত উল্লম্ব খনন পদ্ধতিই ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার মতো শেল গ্যাসের বিশাল স্তর এখানে অনুকূল নয়, ফলে ফ্র্যাকিংয়ের প্রয়োজনও নেই।
গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ইউরোপীয় সিসমোলজিক্যাল কেন্দ্র জানিয়েছে, কম্পনের উৎস ছিল ১০ থেকে ২৭ কিলোমিটার গভীরে, যা গভীর টেকটোনিক ফল্টে সৃষ্ট শক্তির বিস্ফোরণ। এই ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় কয়েকটি আফটারশক অনুভূত হয়েছে।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্র জানিয়েছে, পুরো ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পের সংখ্যা দীর্ঘমেয়াদী গড়ের তুলনায় বেশি, যা ফল্ট লাইনে চাপ জমার ইঙ্গিত বহন করে। দেশের নিচে তিনটি সক্রিয় ফল্ট লাইন আছে, ডফলা ফল্ট, দ্বারিকা ফল্ট এবং মেঘনা ফল্ট জোন। এগুলোতে চাপ জমে থাকলে মাঝেমধ্যেই মাঝারি আকারের ভূমিকম্প হওয়া স্বাভাবিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস উত্তোলন বা সীমিত আকারের অয়েল স্টিমুলেশন থেকে সাধারণত খুব অগভীর ভূমিকম্প হতে পারে, যার মাত্রা সাধারণত ২ থেকে ৩। কখনও ৪ মাত্রা ছাড়ালেও তা বিরল। কিন্তু সাম্প্রতিক কম্পনগুলো ৫-এর ওপরে এবং গভীর ভূতাত্ত্বিক স্তরে ঘটেছে। এটি সরাসরি টেকটোনিক গতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফ্র্যাকিংয়ের যেসব অবকাঠামো সাধারণত দেখা যায় যেমন হাজার হাজার অনুভূমিক কূপ, বিশাল পরিমাণ পানি ও রাসায়নিক পরিবহনের তথ্য, এসবের কোনো চিহ্ন দেশে নেই। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ানপেট্রো ও ডব্লিউওএআর জার্নাল জানিয়েছে, বাংলাদেশের ভূগর্ভে শেল স্তর অনিয়মিত, পাতলা এবং কম ঘন। ফলে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক শেল গ্যাস উত্তোলন এখানে প্রায় অসম্ভব।
ভূমিকম্পের পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পেট্রোবাংলা ৪৮ ঘণ্টার জন্য ড্রিলিং স্থগিত করেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ঝুঁকি পর্যালোচনার অংশ হলেও বড় ভূমিকম্পের কারণ হিসেবে গ্যাস উত্তোলনকে দায়ী করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
সার্বিকভাবে গবেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো বাংলাদেশের প্লেট সীমান্তের স্বাভাবিক গতিশীলতারই ফল। টেকটোনিক চাপ বাড়ায় ভবিষ্যতেও মাঝারি মাত্রার কম্পন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে ফ্র্যাকিং বা গ্যাস উত্তোলন এ ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।