বীরপ্রতীক তারামন বিবি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১ ডিসেম্বর- বীরপ্রতীক তারামন বিবির সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর রাতে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার কাচারীপাড়ায় নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা ও দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় ৬১ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। পরদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে বাড়ির আঙিনায় দাফন করা হয়।
তারামন বিবির জন্ম ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর গ্রামে। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি। খুব ছোটবেলা থেকেই দিনমজুর পরিবারের সঙ্গে জীবিকার টানাপোড়েনে বড় হয়েছেন। কৈশোরে অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। এর মধ্যেই মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হন।
১৯৭১ সালে রাজিবপুর অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর একটি ক্যাম্পে প্রথমে রান্নার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। যোদ্ধাদের খাবার জোগানো, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, পাকবাহিনীর গতিবিধি নজরদারি করা ছিল তার নিয়মিত কাজ। ধীরে ধীরে ক্যাম্পের যোদ্ধাদের সঙ্গে অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণ নেন। পরে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। রাজিবপুর, চর এলাকার মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে তার সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে বীরপ্রতীক খেতাব দেয়। কিন্তু তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর জানতেই পারেননি যে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত নারীদের একজন তিনি। দূরবর্তী নদীবিধৌত অঞ্চলে বসবাস ও দারিদ্র্যের কারণে তার সন্ধান অনেকদিন মিলেনি।
১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের অধ্যাপক বিমল কান্তি দে এবং কুড়িগ্রামের অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকী মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করে তাকে খুঁজে বের করেন। এরপর তাকে ঢাকায় এনে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বীরপ্রতীক পদক তুলে দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
তারামন বিবির জীবনের গল্প লেখক-সাংবাদিক আনিসুল হক তার বই ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’তে তুলে ধরেন। তার জীবনসংগ্রাম ও লড়াই আনিসুল হকের নাটক ‘করিমন বেওয়া’র চরিত্রের অনুপ্রেরণাও হয়।
আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে কুড়িগ্রামসহ দেশজুড়ে বিভিন্ন সংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করছে। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন বীরকন্যা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। সাহস, দেশপ্রেম আর দৃঢ়তার যে উদাহরণ তিনি রেখে গেছেন, তা এখনও প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।