শনিবার ঢাকার দ্য ডেইলি স্ট্যাট সেন্টারে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী মূল প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ ডিসেম্বর- বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে শারীরিক ও ডিজিটাল উভয় ধরনের হুমকি বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকরা। ডিজিটালি রাইটের নতুন একটি গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
ফোজো মিডিয়া ইনস্টিটিউট সুইডেন এবং সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা সিডার সহায়তায় পরিচালিত “ডিজিটাল যুগে মিডিয়া নিরাপত্তা” উদ্যোগের অধীনে এই গবেষণা করা হয়। এতে বলা হয়েছে, অত্যন্ত বিভক্ত এবং অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে আসন্ন নির্বাচনে সহিংসতা ও ভয়ভীতির ঝুঁকি বাড়বে বলে মনে করছেন দেশের বেশিরভাগ সংবাদকর্মী।
শনিবার ঢাকার দ্য ডেইলি স্ট্যাট সেন্টারে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী মূল প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। সম্পাদক ও গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত ছিলেন।
“হাই রিস্কস, লো প্রিপেয়ার্ডনেস: ২০২৬ নির্বাচনে সাংবাদিক নিরাপত্তা” শীর্ষক এই গবেষণাটি ১৯টি জেলার ২০১ জন সাংবাদিকের জরিপ এবং ১০টি বিস্তারিত সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি।
ফলাফলে দেখা গেছে, ৮৯ শতাংশ সাংবাদিক আশঙ্কা করছেন নির্বাচনী প্রচারণা বা ভোট কাভারেজে শারীরিক হামলা বা মারধরের শিকার হতে পারেন। ৭৬ শতাংশ মনে করছেন মৌখিক হেনস্তা এবং ৭১ শতাংশ মনে করছেন ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা বাড়বে। নারী সাংবাদিকদের ঝুঁকি আরও বেশি। জরিপে অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ নারী যৌন হয়রানি এবং ৪০ শতাংশ যৌন নিপীড়নের আশঙ্কা জানিয়েছেন।
ডিজিটাল হুমকির ঝুঁকিও বাড়বে বলে দেখা গেছে। ৭৫ শতাংশ সাংবাদিক মনে করছেন তাদের বা তাদের মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হবে। ৬৫ শতাংশ সাইবার হামলা বা হ্যাকিংয়ের আশঙ্কা করছেন। অনলাইন হয়রানি ও নজরদারি নিয়ে নারী সাংবাদিকদের উদ্বেগ আরও বেশি।
অর্ধেকের বেশি সাংবাদিক আশঙ্কা করছেন যে তাদের বিরুদ্ধে মানহানিকর প্রচারণা চালানো হতে পারে, যা পেশাগত সুনাম ক্ষতির কারণ হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত নয়। সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা কোনো ব্যক্তি বা নীতিমালা নেই। চারজনের মধ্যে একজনেরও কম সাংবাদিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বা সুরক্ষাসামগ্রী পেয়েছেন। ৭৭ শতাংশ জানিয়েছেন যে ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রোটোকলও নেই। পুরুষ সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকার হার নারীদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
৯০ শতাংশের বেশি সাংবাদিক বলেছেন, নির্বাচনী সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই সহিংসতা বা হুমকির মূল উৎস। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীকেও বিশেষ করে নারী ও জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা প্রধান ঝুঁকির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সাংবাদিকরা ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণ হিসেবে রাজনৈতিক লেবেলিং, গণমাধ্যমের প্রতি আস্থাহীনতা, উগ্রবাদ, জনতার হামলা, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং লক্ষ্য করে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানোর মতো বিষয়গুলোর কথা বলেছেন।
গবেষণায় শারীরিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, স্পষ্ট নিউজরুম প্রোটোকল, লিঙ্গ সংবেদনশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জরুরি ও আইনি সহায়তা বাড়ানোর মতো সুপারিশ করা হয়েছে।
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, মালিকেরা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্ব দেন না। ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও তারা বিনিয়োগ করতে চান না। তাই সাংবাদিকদের নিজেদের সুরক্ষায় নিজেদের উদ্যোগে প্রস্তুত থাকতে হবে।
যমুনা টেলিভিশনের অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর রুকসানা আনজুমান নিকোল বলেন, সাংবাদিকরা নিয়মিত হুমকির মুখে কাজ করেন। বিশেষ করে নারী সাংবাদিকরা যৌনতাকেন্দ্রিক নির্যাতন, অনলাইন হয়রানি এবং ভয় দেখানোর শিকার হন।
সমকাল পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা হয়রানির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের অনেক সময় রাজনৈতিক সুরক্ষা থাকে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে।
অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন টাইমস অব বাংলাদেশের সম্পাদক এম আবুল কালাম আজাদ, এএফপি ব্যুরো চিফ শেখ সাবিহা আলম, নিউ এজের চিফ রিপোর্টার মুস্তাফিজুর রহমান, বিডিনিউজের চিফ রিপোর্টার জাহিদুল কবির, আরটিভির চিফ নিউজ এডিটর এলিয়াস হোসেন এবং একাত্তর টিভির বিশেষ প্রতিবেদক শাহনাজ শারমিন। ফোজো মিডিয়া ইনস্টিটিউটের এশিয়া প্রকল্প সমন্বয়কারী মারিয়া পিটারসন অনলাইনে যুক্ত ছিলেন।
সূত্রঃ ঢাকা ট্রিবিউন