বাংলাদেশের একটি পোষাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিক। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ ডিসেম্বর- বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারক ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প আমলের শুল্কনীতি পুনরায় কার্যকর হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে ব্যয় বেড়েছে এবং ফ্যাশন শিল্পে বড় প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে অনেক ক্রেতা পোশাক কেনায় কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছেন।
রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে মুদ্রাস্ফীতি ওঠানামা করায় ভোক্তারা নতুন পোশাক কেনায় আগের মতো আগ্রহী নন। বড় অর্ডারের বদলে এখন খুচরা অর্ডার দিচ্ছেন।
টানা চার মাস রপ্তানি কমেছে
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চার মাস ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমছে।
নভেম্বর ২০২৫-এ রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের নভেম্বরের তুলনায় ৫ শতাংশ কম।অক্টোবরে রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে কমেছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগস্টে কমেছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
অর্ডার কমেছে ৫ থেকে ১০ শতাংশ
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রপ্তানির মৌসুম থাকে, কিন্তু এ বছর অর্ডার দৃশ্যমানভাবে কম। তার ভাষায়, অর্ডার ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমে গেছে এবং নিু ও মধ্যম দামের পণ্যের অর্ডার সবচেয়ে বেশি কমেছে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পর দাম বেড়েছে, কিন্তু ক্রেতাদের বাজেট বাড়েনি। আগে যেখানে তিনটি পণ্য কিনতেন, এখন একটিই নিচ্ছেন। শিশু ও নারীদের পোশাকের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও বেসিক পণ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি কমেছে।
রপ্তানিকারকরা সতর্ক করেছেন, এই ধারা চলতে থাকলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে, মুনাফা কমবে এবং চাকরির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে আস্থা কমেছে
ম্যাককিনসি অ্যান্ড কোম্পানির স্টেট অব ফ্যাশন ২০২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোক্তা আস্থা কমে যাওয়ায় ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও ফ্যাশন খাত চাপের মধ্যে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনে ফ্যাশন বাজার খুব কম হারে বাড়ছে, ফলে রপ্তানিকারকদের অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিসরের নতুন শুল্ক আরোপ করেছে যা পোশাকসহ নানা পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে অনেক দেশও প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছে, ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা অস্থির হয়ে উঠেছে।
ইউরোপে প্রতিযোগিতা বাড়ছে চীন ও ভারতের
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির নির্বাহী সভাপতি ফজলি শামীম ইহসান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাব ইউরোপেও পড়েছে। সতর্ক বাজেটে থাকা ক্রেতারা কম কেনাকাটা করছেন। ব্ল্যাক ফ্রাইডের মতো ডিসকাউন্ট ইভেন্টের দিকে ঝুঁকে পড়ায় সাধারণ সময়ে বিক্রি কমে গেছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক এড়াতে চীনা ও ভারতীয় পোশাক প্রস্তুতকারকরা ইউরোপে রপ্তানি বাড়িয়েছেন। এতে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হচ্ছে।
অনেক কারখানা নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছাড়াই চলছে
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার ফলে বাণিজ্য কমছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কমবে। এতে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে।
নীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে এখনই উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে।
শোভন ইসলাম বলেন, নতুন বাজারে রপ্তানির জন্য আগে ৪ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়া যেত, যা এখন ২ শতাংশে নেমেছে। আগের হার থাকলে ক্রেতাদের ছাড় দিতে সুবিধা হতো।
ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের মোহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান এখনো ভালো হলেও নিটওয়্যারের অর্ডার কমে যাওয়ায় সতর্ক সংকেত তৈরি হয়েছে। নতুন বাজার খোঁজা এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ছাড়া ভবিষ্যতে টিকে থাকা কঠিন হবে।
২০২৪ ২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৯.৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮.৮৪ শতাংশ বেশি।