মেলবোর্ন, ৮ ডিসেম্বর- ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দিন হিসেবে চিহ্নিত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি যশোর দুর্গ মুক্ত হওয়ার খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিকামী বাহিনী এবং ভারতীয় সেনারা ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন। এদিন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সিলেট শহর ও ঝিনাইদহ সড়ক ঘাঁটিও শত্রুমুক্ত হয়ে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যাওয়া শুরু করে।
যশোর মুক্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারতের সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল এস এইচ এফ জে মানেকশ পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশ্যে বার্তা পাঠান।
তিনি বলেন, “দেরি হওয়ার আগে অস্ত্র সমর্পণ করুন। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আপনার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে।” বার্তাটি প্রতি আধা ঘণ্টা অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রচার করা হয়, যাতে পালানোর সকল পথ বন্ধ এবং রসদ সরবরাহ ব্যাহত হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক সিডনি শনবার্গ যশোর শহরে পৌঁছে মানুষের উল্লাস ও উদযাপনের বর্ণনা দিয়েছেন। শহরের ছাদে উড়ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ-সোনালি পতাকা। লোকজন রাস্তায় উল্লাস করছে, স্লোগান দিচ্ছে “স্বাধীন বাংলা, শেখ মুজিব।” তবে আনন্দের মধ্যে আছে বিষণ্নতার ছাপ, কারণ পাকিস্তানি সেনারা যশোরে পাঁচ হাজার মানুষ হত্যা করেছে এবং বেশিরভাগ নিখোঁজ বা শরণার্থী শিবিরে লুকিয়ে আছে।
যশোরের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকার দিকে পালানোর চেষ্টা শুরু করে। তারা গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও অবকাঠামো ধ্বংস করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ঢাকার কাছে ৪০ মাইল দূরে এই সময় শত্রু অবস্থান করছিল। পাকিস্তানি সেনাদের এই পিছু হটাকে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের দিকে অগ্রগতির প্রথম বড় সংকেত হিসেবে দেখা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিদরা একমত, যশোরের পতন হলো “শেষের শুরু।” আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছিল, “সব তার্কিকদের সংশয় পরাস্ত, সব শেখানো বুলি মিথ্যা প্রমাণিত, একটি জাতি ক্রমে ক্রমে প্রতিষ্ঠিত ও জয়ী হচ্ছে। তাহার সূচনা যশোহর, তাহার নমুনা সিলেট।” এই দিনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে বিজয়ের সূচনালক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে স্থান পেয়েছে।
যশোর মুক্তি শুধু সামরিক সাফল্য ছিল না; এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আশার নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। শহরের মানুষ স্বাধীনভাবে প্রথম দিনটি কাটায়, উল্লাসের সঙ্গে স্মরণ করে তাদের সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাস। বিজয়ের এই মাসের সূচনা হিসেবে ৭ ডিসেম্বর স্মরণীয় হয়ে থাকল ইতিহাসের পাতায়।
সুত্রঃ সমকাল