মেলবোর্ন, ৯ ডিসেম্বর- বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দূরত্ব তৈরি করে নিজেদের নতুন করে একটি উদার, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এ অবস্থান পরিবর্তন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এ পরিবর্তন এসেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের ১৬ মাস পর। মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বিরোধীদের দমন এবং ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-বিদ্রোহের পর তার দীর্ঘ শাসন অধ্যায় শেষ হয়। আওয়ামী লীগ নিজেদের সবসময় ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার শক্তি বলে পরিচয় দিত। যদিও সমালোচকেরা বলতেন, এটি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক মূলত আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। আদর্শগত দূরত্ব সবসময়ই ছিল। বিএনপি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী, আর জামায়াতের ভিত্তি ধর্মীয় পরিচয় ও ইসলামী মতাদর্শ। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তারা যৌথভাবে সরকারে ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় এই দীর্ঘদিনের জোট এখন ভেঙে গেছে।
সম্প্রতি দলীয় সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, সেই যুদ্ধের সময়ে জামায়াতের অবস্থান দেশবাসী জানে। সরাসরি নাম না নিলেও বার্তাটি স্পষ্ট ছিল। তিনি ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগও তোলেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেন, ধর্মের নামে দেশকে বিভক্ত করা উচিত নয়। বিএনপির রাজনীতি হওয়া উচিত জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র এবং ১৯৭১–এর চেতনার ওপর।
হঠাৎ এই মোড় পরিবর্তনের কারণ কী?
বিএনপি মনে করছে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন নিজেদের যেভাবে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের একমাত্র ধারক বলে দাবি করেছে, এখন সেই জায়গাটি খালি পড়ে আছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে বিরোধী দল দমন, জামায়াত নিষিদ্ধকরণ এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে রাজনৈতিক মাঠ একচেটিয়া করেছিলেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনও ব্যাপক অনিয়মের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। এখন আওয়ামী লীগও নিষিদ্ধ, আর হাসিনা নির্বাসিত অবস্থায় ভারতে।
এই পরিস্থিতিতে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন আশ্রয় খুঁজছে জনগণ। বিএনপি চাইছে সেই শূন্যস্থান দখল করতে। এজন্য তারা ইসলামী দল জামায়াত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কারণ তরুণ প্রজন্ম, শহুরে মধ্যবিত্ত ও উদীয়মান নাগরিক সমাজ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি অনেকটাই অনাস্থাশীল।
বিএনপি ও জামায়াতের মতপার্থক্য অবশ্য নতুন নয়। নির্বাচন আগে সংস্কার, সংবিধান সংশোধন, এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে তারা মাসের পর মাস দূরত্বে ছিল। শেষ পর্যন্ত মতবিরোধই সম্পর্কের ইতি টেনেছে। তবে এটি কেবল কৌশলগত মতপার্থক্য নয়, আদর্শগত অবস্থানও পুনর্বিন্যাস করছে বিএনপি।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের একচেটিয়াত্বের বিরুদ্ধেও নতুন ভাষায় কথা বলতে চাইছে বিএনপি। তরুণ ভোটারদের কাছে তারা মুক্তিযুদ্ধকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চেতনার একটি আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরছে। এতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক গল্পের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তনের ঝুঁকিও আছে। বিএনপির ভেতর কিছু অংশ এই উদার পরিচয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে। আবার ২০২৪ সালের আন্দোলনে উঠে আসা যুব সংগঠন NCPসহ বিভিন্ন নাগরিক প্ল্যাটফর্মও একই রাজনৈতিক স্পেসের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এতে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কাও আছে।
তবুও বিএনপির নতুন কৌশল আপাতত সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হচ্ছে। দলটি আর নিজেকে কেন্দ্র-ডান পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। তারা চায় সাবেক আওয়ামী লীগ সমর্থক, শহুরে উদার জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং নতুন রাজনৈতিকভাবে সচেতন তরুণদের একটি বড় প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে।
এই পরিবর্তনের সাফল্য নির্ভর করবে একটাই বিষয়ে: জনগণ কি বিশ্বাস করবে যে বিএনপির জামায়াত থেকে বিচ্ছেদ সত্যিকারের আদর্শগত সিদ্ধান্ত, নাকি নির্বাচন ঘিরে তৈরি করা কৌশলগত দূরত্ব?
এ মুহূর্তে একটি বিষয় পরিষ্কার। ২০২৫ সালের বিএনপি আর আগের বিএনপি নয়। তারা নতুন ভাষায় কথা বলছে। অন্তর্ভুক্তি, গণতন্ত্র ও বিভাজনহীন রাজনীতির ভাষা। এই পরিবর্তন যদি টিকে থাকে, তাহলে এটি ৯০–এর দশকের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুনর্গঠন হয়ে উঠতে পারে। যেখানে একদা কেন্দ্র-ডান পরিচয়ের বিএনপি নতুন করে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে চায়, হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে।
সূত্রঃ আল জাজিরা