বাংলাদেশ

পাচারের শিকার হয়ে সমুদ্রে হারাচ্ছে এক রোহিঙ্গা প্রজন্ম

  • 3:35 pm - December 11, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৭০ বার
ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১১ ডিসেম্বর- বাংলাদেশে কাজ ও শিক্ষার সুযোগ বন্ধ হওয়ায় হাজারো রোহিঙ্গা শরণার্থী নৌকায় জীবনবাজি রেখে বিপদজনক সমুদ্র পথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছে। তাদের অনেককেই পথে দালালচক্র মারধর করে মুক্তিপণ আদায় করছে, যা এই যাত্রাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

মজুমা বেগম রাত তিনটা পর্যন্ত ছেলের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। যখন বুঝলেন সে আর ফিরছে না, তখনই তার ভয় সত্যে পরিণত হলো। পরদিন ছেলে ফোনে জানাল, সে উপকূলে পৌঁছে নৌকায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যেতে প্রস্তুত। মজুমা তাকে এই যাত্রা বন্ধ করতে মরিয়া ছিলেন, কিন্তু ছেলে তার নিজ সিদ্ধান্তে অটল ছিল।

নভেম্বরে মালয়েশিয়া উপকূলে একটি রোহিঙ্গাবোঝাই নৌকা ডুবে ডজনখানেক মানুষ মারা যাওয়ার খবর মজুমার আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। অবশেষে ছেলের গন্তব্যে পৌঁছানোর খবর পেয়ে তিনি কিছুটা স্বস্তি পান।

মজুমার ১৬ বছরের ছেলে আবু মুসা হলেন কয়েক হাজার রোহিঙ্গার একজন, যারা গত দুই মাসে নৌকায় মালয়েশিয়া পৌঁছেছেন। আরাকান প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, যারা দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা নৌযাত্রা পর্যবেক্ষণ করছে, তাদের হিসাব অনুযায়ী মুসা তাদের সাম্প্রতিক যাত্রার অংশ।

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ ছাড়ছে কারণ সাহায্য কমে যাওয়ায় খাবারের রেশন ও স্বাস্থ্যসেবা সংকুচিত হয়েছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা অনেকের ওপর দশকের পর দশক ধরে চলা সহিংসতা ও নির্যাতন চাপিয়ে দিয়েছে অতিরিক্ত ভয়।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর গণহত্যামূলক অভিযানের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা তিন-চতুর্থাংশ। বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে বসবাস করছে।

বাংলাদেশ সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে তারা কাজ করতে পারে না, ক্যাম্পের বাইরে যেতে পারে না এবং শিক্ষার সুযোগও সীমিত। ২০২৪ সালের পর রাখাইনের সংঘাত থেকে আরও দুই লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

মজুমা বেগম বলেন, “তার যাত্রার কথা জিজ্ঞেস করলে সে শুধু কাঁদে, কিছুই বলতে পারে না।”

আরাকান প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে উপসাগরীয় এলাকা দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে ২২টি নৌকা গেছে, যেগুলোতে প্রায় চার হাজার মানুষ ছিলেন।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানায়, চলতি বছরে সমুদ্রপথে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করা বা আরও দূরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টায় ৬০০ রোহিঙ্গা মারা গেছে বা নিখোঁজ রয়েছে।

মানুষ পাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখায়, কিন্তু যাত্রাপথে অনেককে অপহরণ করে বিভিন্ন পর্যায়ে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।

আরাকান প্রজেক্টের সমন্বয়ক ক্রিস লেওয়া বলেন, “মুক্তিপণ দিতে দেরি হলে তাদের মারধর করা হয়। অনেক সময় ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিবারের সামনে পেটানো হয়, যাতে দ্রুত টাকা পাঠানো হয়।”

তিনি জানান, নারীদেরও মারধর করা হয়, কখনও পায়ের গোড়ালি কাঠে আটকে নির্যাতন চালানো হয়।

আবু মুসা বাংলাদেশ ছেড়েছে কারণ তার ভাষায়, “এখানে কাজ বা পড়াশোনার সুযোগ নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই।” বন্ধুদের সঙ্গে সে টেকনাফে পৌঁছে নৌকায় ওঠে। মালয়েশিয়া পৌঁছাতে সময় লাগে ২৬ দিন। এর মধ্যে ছিল সাগরে দুই সপ্তাহ এবং মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের জঙ্গলে দালালদের গোপন ক্যাম্পে আটক থাকা। শেষ দিকে টানা ছয় দিন তারা খাবারও পাননি।

২০১৫ সালের নৌপথের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি প্রায় সমান রকম। Human Rights Watch বলেছিল, তখন তিন বছরে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা পাচার করা হয়েছিল। থাইল্যান্ডে গণকবর পাওয়া গেলে দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছিল। এখন আবার নেটওয়ার্কগুলো সক্রিয় হচ্ছে, কারণ বাংলাদেশে সাহায্য কমে যাওয়া এবং মিয়ানমারে সহিংসতা রোহিঙ্গাদের মরিয়া করে তুলেছে।

এক নারী রোহিঙ্গা দালাল জানিয়েছেন, আগে তাকে মানুষ খুঁজতে হতো, এখন মানুষই তার কাছে আসে। তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে পাঠানোর জন্য পাচারকারীদের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা পান, আর প্রতিজন যাত্রীর কাছ থেকে আদায় করা হয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।

১৩ বছরের ফুরকাহানও অক্টোবরের শেষ দিকে নিখোঁজ হয়। দুই দিন পর দালালরা ফোন করে জানায় সে মালয়েশিয়ার পথে এবং নিরাপদ পৌঁছানোর জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। ২৯ অক্টোবর নৌকা ছাড়ে। এরপর আর কোনো খবর নেই। ধারণা করা হচ্ছে সে হয়তো ৯ নভেম্বর মালয়েশিয়া–থাইল্যান্ড সীমান্তে ডুবে যাওয়া নৌকাটিতে ছিল, যাতে প্রায় ৭০ জন ছিলেন। এখন পর্যন্ত ৩৬টি লাশ উদ্ধার হয়েছে, ২৬ জনকে বাঁচানো গেছে, আটজন নিখোঁজ।

২৪ বছরের রোবিনা বিবি ও তার পাঁচ বছরের সন্তানও ডুবে মারা গেছে। তার স্বামী মালয়েশিয়া থেকে তাকে যেতে বাধ্য করেছিলেন বলে পরিবার জানায়। প্রথমে দালালরা আশ্বস্ত করলেও পরে জানায় নৌকা ডুবে গেছে। এখন দালালরা আর ফোন ধরেন না।

রোবিনার বাবা আবুল বাসার বলেন, “মেয়েকে হারিয়ে আমার সব শেষ। তার মা শোকে অচেতন হয়ে আছে। সে পানিকে ভয় পেত, তাকে যেতে হতো না। কিন্তু তাকে জোর করা হয়েছিল।”

তিনি যোগ করেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হওয়ায় এই মৃত্যু থামছে না। “বিশ্ব যদি এখনই কিছু না করে, পুরো রোহিঙ্গা প্রজন্ম সমুদ্র আর জঙ্গলে হারিয়ে যাবে।”

সুত্র: the Guardian

এই শাখার আরও খবর

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ঘিরে উত্তাল ঢাকা, আওয়ামী লীগ কি তাহলে ফিরছে?

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা…

আদাবর থানার পাশে দুই হাতবোমা বিস্ফোরণ

রাজধানীর ঢাকার আদাবর থানার পাশে দুটি হাতবোমা বা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাত ৯টা ৫ মিনিটের দিকে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি…

নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সদস্যের হাত-পা ভেঙে কেটে দেওয়া হলো রগ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় আবুল কালাম নামে এক পুলিশ সদস্যের ওপর নৃশংস হামলার অভিযোগ উঠেছে। তাঁকে নির্জন বিলে ডেকে…

ঢাকার বারিধারায় বৈশাখী পরিবহনের বাসে আগুন

রাজধানীর বারিধারায় প্রগতি সরণিতে বৈশাখী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে বারিধারার ‘জে’ ব্লক এলাকায় এ ঘটনা…

কক্সবাজারে ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে গুলি, অভিযোগ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে

কক্সবাজারের খরুলিয়ায় তিনটি মোটরসাইকেলে এসে একটি মাইক্রোবাসের গতিরোধ করে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করেছে ছয় ব্যক্তি। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে সদর উপজেলার খরুলিয়া লাল গোলাপ কমিউনিটি…

খুলনায় রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতির মুখে কালি, পাশে রবীন্দ্রবিরোধী পোস্টার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফর উপলক্ষে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে আঁকা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতির মুখে কালি মাখিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে প্রতিকৃতিটির পাশে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au