মেলবোর্ন, ১২ ডিসেম্বর- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনের তৎপরতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নয় মাসের যুদ্ধজুড়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল রণাঙ্গনের পরিস্থিতিতে। ইতিহাসবিদদের মতে, মাঠে যুদ্ধ যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কৌশলও বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
নয় মাসের সেই যুদ্ধে অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। অসংখ্য গৌরব, ত্যাগ আর বেদনামথিত মুহূর্তের ভিড়ে কিছু ঘটনা বিশেষভাবে বাংলাদেশকে বিজয়ের দিকে এগিয়ে দেয়। এই লেখায় সেইসব গুরুত্বপূর্ণ আটটি মুহূর্ত তুলে ধরা হলো। রাজনীতি, কূটনীতি ও যুদ্ধক্ষেত্রের এই ঘটনাগুলো তখন যেমন আলোচিত ছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও তেমন এক স্থায়ী চিহ্ন রেখে গেছে।
সত্তরের জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছিল। তীব্র উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ গণহত্যা এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীনতা সংগ্রামকে নিশ্চিত পথ দেখায়। এরপর ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়।
নিচে আলোচনা করা হলো মুক্তিযুদ্ধের সেই আটটি গুরুত্বপূর্ণ ও মোড় ঘোরানো ঘটনা।
স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণার পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। সাতই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণ আন্দোলনকে আরও সুসংগঠিত করে।
পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তারা পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবেন তা বুঝতে না পেরে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। অসহযোগ আন্দোলন ঠেকাতে এবং পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ২৫ মার্চ রাতে চালানো হয় কুখ্যাত অপারেশন সার্চলাইট। নির্বিচারে গণহত্যায় সেই রাতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ নিহত হয় বলে ধারণা করা হয়।
শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা আগে তাজউদ্দীন আহমদ, ড. কামাল হোসেন ও আমীর উল ইসলাম তাঁর সঙ্গে শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করেন। ড. কামাল হোসেন পরে বলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁদের নিরাপদ জায়গায় গিয়ে প্রতিরোধ সংগঠিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার তীব্রতা কিছুটা হলেও কমে যাবে, আর তাঁকে না পেলে আরও বেশি সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবিঃ আর্কাইভ
রাতেই পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তর করে।
২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার শুরু হয়। চট্টগ্রাম বেতারের কয়েকজন কর্মী কালুরঘাটে একটি ছোট কেন্দ্র থেকে প্রথম সম্প্রচার চালান। সেদিন এম এ হান্নান শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় দ্বিতীয়বারের মতো প্রচার করা হয়, যেখানে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবের নামে ঘোষণা পাঠ করেন।
মুজিবনগর সরকার গঠন
২৫ মার্চের হামলার পর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা আত্মগোপনে যান এবং অনেকেই ভারতে আশ্রয় নেন। ৩ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেন। লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদের গবেষণা অনুযায়ী, সেদিনই অস্থায়ী সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা হয়।
ভারতের সহযোগিতায় ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়, যা পরে মুজিবনগর নামে পরিচিত হয়। এই সরকারে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হন।

মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার দেয়ার হচ্ছে। ছবিঃ আর্কাইভ
এ সময় কলকাতায় পাকিস্তানের উপদূতাবাসে উপহাইকমিশনার ছিলেন হোসেন আলী। প্রবাসী সরকার গঠনের পর তিনি তাঁর পুরো স্টাফসহ পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করে দূতাবাসকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিদেশি কূটনৈতিক মিশনে রূপান্তরিত করেন। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে দাঁড়ায়।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মুনতাসির মামুন বলেন, হোসেন আলীর এই পদক্ষেপ বিশ্ব কূটনীতিক মহলে বড় আলোড়ন তোলে এবং বাংলাদেশের সংগ্রাম বিশ্বদরবারে আরও দৃশ্যমান হয়।
মুক্তিবাহিনী ও সেক্টর গঠন
২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার পরপরই সামরিক বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসারের বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করে। তরুণেরা নিজ উদ্যোগে স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এসব বাহিনী একত্রে পরিচিত হয় মুক্তিবাহিনী নামে। ছাত্র, জনতা, নিয়মিত বাহিনী সবাই মিলে এর অংশ।
মোজিব বাহিনী নামে পরিচিত বিএলএফ ছিল মুক্তিবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী অংশ, যা আওয়ামী লীগের চার যুবনেতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে।

৪ এপ্রিল সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করা হয়। সেখানেই এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনানায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং দেশকে চারটি সামরিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়। পরে জুলাইয়ে কলকাতায় প্রবাসী সরকারের সদর দপ্তরে দীর্ঘ সম্মেলনে দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি সেক্টরে একজন কমান্ডার নিয়োগ দেওয়া হয়। এই কাঠামো মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার ভিত্তি তৈরি করে।
অপারেশন জ্যাকপট
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সফল নৌ-অভিযান ছিল অপারেশন জ্যাকপট। ১৬ আগস্ট ভোরে চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর এবং নারায়ণগঞ্জে নৌকমান্ডোদের সমন্বিত হামলা হয়। মে মাস থেকেই পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ চলছিল।

মেজর রফিকুল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, পাকিস্তানি বাহিনীর জাহাজ ও নৌপরিবহন ব্যবস্থা অচল করা ছিল এ অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। অপারেশনে ২৬টি জাহাজ ধ্বংস হয় এবং নৌপথে পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ সরবরাহ ভেঙে পড়ে। এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র, আর পাকিস্তানের প্রচারযুদ্ধ পশ্চাৎপদ অবস্থায় পড়ে।
আখাউড়া দখলের যুদ্ধ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া মুক্তিযুদ্ধের একটি কৌশলগত পয়েন্ট ছিল। এখানে জয়ী হওয়া গেলে মুক্তিবাহিনী সহজে সিলেটমুখী অভিযান চালাতে পারত। পাকিস্তানি বাহিনীর জন্যও এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা সিলেটমুখী রেলপথ এদিক দিয়েই যেত।

৩০ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী, ভারতের মিত্রবাহিনী এবং পাকিস্তানি বাহিনী মুখোমুখি হয়। প্রথমদিকে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ সফল হলেও পাকিস্তানি বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। কিন্তু ৩ ডিসেম্বর ভারতের যুদ্ধ ঘোষণা করার পর ৪ ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় ট্যাংক বাহিনী যুদ্ধে যোগ দেয়।
৫ ডিসেম্বর যৌথবাহিনী আখাউড়াকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং শেষপর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ৪ ব্রিগেডের পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে। এ জয় মুক্তিযুদ্ধের অগ্রযাত্রা ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করে।
ভারত সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সংগ্রামের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সমর্থক ছিল ভারত। প্রবাসী সরকার পরিচালনা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্রসরবরাহ, আশ্রয় ও কূটনৈতিক সহায়তায় ভারত ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশীদার। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব ও চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন ভারতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।
৯ আগস্ট ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি হয়। চুক্তির ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়, কোনো পক্ষ হুমকির মুখে পড়লে অন্য পক্ষ সহায়তায় এগিয়ে আসবে। এই সমর্থন ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে নামার সাহস জোগায়। ইতিহাসবিদদের মতে, এ চুক্তি পশ্চিমা বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে ভারতের পাশে তখন একটি পরাশক্তি দাঁড়িয়ে আছে।
জাতিসংঘের প্রস্তাব
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জাতিসংঘ মূলত মানবিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ ছিল। পাকিস্তানের দমননীতির বিরুদ্ধে তারা তেমন শক্ত কোনো অবস্থান নিতে পারেনি বলে গবেষক মুনতাসির মামুন মনে করেন। তবে যুদ্ধের শেষদিকে যখন পাকিস্তানের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত, তখন পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। সেই ধাপটি নিয়ে আলোচনা এখানে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, তবে পুরো ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।
সূত্রঃ বিবিসি নিউজ