পাকিস্তানের এফ–১৬ যুদ্ধবিমান। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১২ ডিসেম্বর- পাকিস্তানের এফ–১৬ যুদ্ধবিমান আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি বিক্রিতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন অনুমোদন দিয়েছে। ফলে এই যুদ্ধবিমানগুলো আরও উন্নত সক্ষমতা পাবে। মোট ৬৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি পাকিস্তান কিনবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে।
দুই দেশের মধ্যে এই সমঝোতা এমন সময় হলো, যখন পাকিস্তান ও ভারতের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ। কাশ্মীরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর এ বছরের মে মাসে দুই দেশ সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। একই সময়ে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কিনতে চাপ দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের চুক্তির পেছনের প্রেক্ষাপট
ব্রাসেলসভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পারভীন দোনথি জানান, এ অনুমোদন আসলে ২০২২ সালের একটি চুক্তির অংশ। সেই চুক্তিতে পাকিস্তানের এফ–১৬ যুদ্ধবিমান আধুনিকায়নের পরিকল্পনা ছিল।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর মধ্যে এফ–১৬ এখনো শীর্ষে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন থেকে শুরু করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পর্যন্ত এই প্রকল্পের ওপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে এফ–১৬ ব্যবহারে দুই পক্ষেরই কৌশলগত স্বার্থ আছে।

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (মাঝখানে)। এ সময় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ফাইল ছবি
পাকিস্তানের কাছে এখন ৭০ থেকে ৮০টি ব্যবহারযোগ্য এফ–১৬ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এগুলোর কিছু পুরোনো ব্লক–১৫ সংস্করণ যা পরে আপগ্রেড করা হয়েছে, কিছু এসেছে জর্ডানের কাছ থেকে, আর কিছু তুলনামূলক নতুন ব্লক–৫২ সংস্করণের।
এবারের চুক্তির আওতায় পাকিস্তান শুধু যন্ত্রাংশ নয়, আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি পাবে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ৯২টি ‘লিংক–১৬’ ব্যবস্থা। এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং স্থলবাহিনী একই সঙ্গে বার্তা ও ছবি আদান–প্রদান করতে পারে।
এফ–১৬ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
‘এফ–১৬ ফাইটিং ফ্যালকন’ বা ‘ভাইপার’ এক ইঞ্জিনের বহুমুখী যুদ্ধবিমান। যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশটির বহু মিত্র রাষ্ট্র আকাশযুদ্ধ ও আকাশ থেকে ভূমিতে হামলার জন্য এটি ব্যবহার করে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষ দিকে সোভিয়েত মিগ যুদ্ধবিমানের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এর উৎপাদন শুরু হয়। প্রথম উড্ডয়ন ১৯৭৪ সালে। বর্তমানে লকহিড মার্টিন এই যুদ্ধবিমান তৈরি করে এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানের একটি।
মোট ২৯টি দেশ এফ–১৬ চালায়। পাকিস্তানের পাশাপাশি ইউক্রেন, তুরস্ক, ইসরায়েল, মিসর, পোল্যান্ড, গ্রিস, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও নরওয়ে এসব দেশেও এর ব্যবহার আছে।
ভারত–পাকিস্তান সংঘাতে এফ–১৬–এর ভূমিকা
এ বছরের এপ্রিল মাসে কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলায় ২৬ জন নিহত হলে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। পাকিস্তান অভিযোগ অস্বীকার করলেও দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত উত্তপ্ত হয়। ৭ মে দুই দেশ পাল্টাপাল্টি অভিযান চালায়।
সেই সময় পাকিস্তান ৪২টি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে। এর মধ্যে এফ–১৬ ছাড়াও ছিল চীনের তৈরি জেএফ–১৭ এবং জে–১০। ইসলামাবাদ দাবি করে ভারতের কয়েকটি যুদ্ধবিমান তারা ভূপাতিত করেছে। শুরুতে ভারত অস্বীকার করলেও পরে ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে।
যুক্তরাষ্ট্র কি ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত এমন সময় এল, যখন ভারতকে মার্কিন অস্ত্র কিনতে ট্রাম্প প্রশাসন চাপ দিচ্ছে। গত আগস্টে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার পরিকল্পনা স্থগিত করে।
এ ছাড়া ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরও বাতিল হয়েছে, যা ওয়াশিংটনের অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে।
বাণিজ্য নিয়েও দুই দেশের সম্পর্ক অস্বস্তিকর। ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছেন। এর পেছনে রয়েছে ভারতের কম দামে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাম্প্রতিক ভারত সফরে তিনি জানিয়েছেন, রাশিয়া ভারতকে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ করে যাবে।
কেমন হতে পারে ভারতের প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তান এফ–১৬ সহযোগিতায় ভারত সবসময় আপত্তি জানিয়েছে। তাদের দাবি, পাকিস্তান এফ–১৬ ভারতবিরোধী অপারেশনে ব্যবহার করে।
পারভীন দোনথি বলেন, পাকিস্তান একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছে। সংঘাতের সময় পাকিস্তান চীনের জে–১০ যুদ্ধবিমানও ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। ইসলামাবাদ দুই পরাশক্তির মাঝামাঝি ভারসাম্য রাখার কৌশল নিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ তাই ভারতের কাছে নতুন উদ্বেগের কারণ হতে পারে।