বাংলাদেশ

নৌ-যুদ্ধের মোড় ঘোরানো অধ্যায়: ১৯৭১

  • 3:37 pm - December 13, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৫২ বার
৩ ডিসেম্বর রাতে বিশাখাপত্তনম উপকূলে এক রহস্যজনক বিস্ফোরণে পিএনএস গাজীর সলিল সমাধি ঘটে।ছবি : সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৩ ডিসেম্বর- ১৯৭১ সাল। একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এই স্বাধীনতা শুধু স্থলভাগের সম্মুখসমর বা গেরিলা আক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারিত হয়েছিল বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশিতে। সমুদ্রের গভীরে একদিকে চলছিল বাঙালি নৌ-কমান্ডোদের দুঃসাহসিক অভিযান, অন্যদিকে একই জলপথে মুখোমুখি অবস্থানে যাচ্ছিল তৎকালীন দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। পিএনএস গাজীর রহস্যজনক ধ্বংস এবং মার্কিন সপ্তম নৌবহরের বিরুদ্ধে সোভিয়েত নৌবাহিনীর কঠোর অবস্থান ১৯৭১-এর যুদ্ধকে এক ভিন্ন মাত্রা দেয়।

ভৌগোলিক বাস্তবতায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন। আকাশপথ সীমিত এবং স্থলপথ চারদিক থেকে অবরুদ্ধ থাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ছিল জীবনরেখা। সৈন্য, অস্ত্র ও রসদ সরবরাহের সবচেয়ে কার্যকর পথ ছিল সমুদ্র। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকেই এই দুর্বলতা চিহ্নিত করেন বাঙালি যোদ্ধারা। তারা উপলব্ধি করেন, সমুদ্রপথে পাকিস্তানের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারলে যুদ্ধের গতিপথ আমূল বদলে যাবে।

নৌ-যুদ্ধের ইতিহাসে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। ফ্রান্সের তুলঁ বন্দরে প্রশিক্ষণরত আটজন বাঙালি সাবমেরিনার পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাঁদের নেতৃত্বে এবং মিত্রপক্ষের গোপন সহায়তায় গড়ে ওঠে এক দুর্ধর্ষ নৌ-কমান্ডো বাহিনী।

১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট গভীর রাতে কোনো আধুনিক ডাইভিং সরঞ্জাম ছাড়াই শুধু ফিনস ও লিম্পেট মাইন নিয়ে কমান্ডোরা একযোগে হামলা চালান চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে। মুহূর্তেই বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে বন্দর এলাকা। এক রাতেই তলিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনীর রসদবাহী একাধিক জাহাজ। অস্ত্রবোঝাই এমভি আল-আব্বাস ধ্বংস হওয়ার ফলে পাকিস্তানি সামরিক সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে।

এই অভিযানের পর আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বন্দরগুলোকে ‘বিপজ্জনক অঞ্চল’ ঘোষণা করে। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের রপ্তানি আয় কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অপারেশন জ্যাকপট শুধু সামরিক সাফল্য নয়, এটি ছিল অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাত, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

নভেম্বরের শেষ দিকে পরিস্থিতি হাতছাড়া হতে দেখে পাকিস্তান তাদের শেষ বড় অস্ত্র হিসেবে মাঠে নামে পিএনএস গাজী। যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত এই সাবমেরিনটি ছিল সে সময় এশিয়ার একমাত্র দীর্ঘপাল্লার সাবমেরিন। এর লক্ষ্য ছিল মিত্রপক্ষের নৌবহর বা বিমানবাহী রণতরী ধ্বংস করে বঙ্গোপসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা।

কিন্তু ৩ ডিসেম্বর রাতে ভারতের বিশাখাপত্তনম উপকূলে এক রহস্যজনক বিস্ফোরণে গাজীর সলিল সমাধি ঘটে। ডেপথ চার্জ নাকি অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণ, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর ফল ছিল নির্ধারক। গাজীর পতনের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিত্রপক্ষের পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সমুদ্রপথে পিছু হটার শেষ সুযোগটুকুও বন্ধ হয়ে যায়।

ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে যৌথ বাহিনী যখন ঢাকার উপকণ্ঠে, তখন যুক্তরাষ্ট্র এক শেষ কূটনৈতিক ও সামরিক চাল দেয়। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের নির্দেশে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হয় কুখ্যাত সপ্তম নৌবহর, টাস্ক ফোর্স ৭৪। বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের নেতৃত্বে এই বহরের উদ্দেশ্য ছিল শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেওয়া।

এটি ছিল তথাকথিত গানবোট ডিপ্লোম্যাসি। পারমাণবিক শক্তির হুমকিতে যৌথ বাহিনীকে থামিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য এটি ছিল এক ভয়াবহ সংকট।

মার্কিন সপ্তম নৌবহর যখন মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভারত-সোভিয়েত নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভ্লাদিভস্তক থেকে পাঠানো হয় সোভিয়েত নৌবাহিনীর দশম অপারেটিভ ব্যাটল গ্রুপ।

অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির ক্রুগলিয়াকভের নেতৃত্বে সোভিয়েত বহরটি মার্কিন নৌবহরের সামনে অবস্থান নেয়। এক নাটকীয় পদক্ষেপে সোভিয়েত পারমাণবিক মিসাইলবাহী সাবমেরিনগুলোকে পানির ওপর ভেসে উঠতে নির্দেশ দেওয়া হয়। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট ও কঠোর। সামনে এগোলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।

এই অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বুঝে যায়, এক ধাপ এগোলেই তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পারমাণবিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ফলে পরাক্রমশালী সপ্তম নৌবহর থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়।

স্থলভাগে ঢাকার পতনের আগে সমুদ্রেই কার্যত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল যুদ্ধের ফলাফল। নৌ-কমান্ডোদের সাহসী অভিযান, পিএনএস গাজীর পতন এবং পরাশক্তিদের মুখোমুখি অবস্থান মিলিয়ে বঙ্গোপসাগর হয়ে ওঠে ১৯৭১-এর এক নীরব কিন্তু  যুদ্ধক্ষেত্র। এই জলরাশিতেই রচিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার নৌ-ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সুত্রঃসমকাল

এই শাখার আরও খবর

দীর্ঘ সময় ইতালির ক্ষমতায় থাকা মেলোনিকে মোদির শুভেচ্ছা, কী ছিল বার্তায়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছেন জর্জিয়া মেলোনি। এই সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র…

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ: জাতিসংঘ

জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ এবং বাণিজ্যিক অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত আগস্টে আন্তর্জাতিক খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক বেড়ে ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে…

অটো পাইলট মোডে মহাসড়কের মাঝখানে থেমে যায় টেসলা, পেছন থেকে ট্রাকের ধাক্কায় চালক নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় গভীর রাতে ব্যস্ত মহাসড়কের মাঝখানে একটি টেসলা গাড়ি হঠাৎ সম্পূর্ণ থেমে যাওয়ার পর পেছন থেকে আসা বিশালাকৃতির ফোর্ড এফ-৩৫০ পিকআপ ট্রাকের ধাক্কায় গাড়িটির…

বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে ইহুদিবিদ্বেষের হুমকি অবমূল্যায়িত হয়েছিল: মাইক বার্জেস

সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক…

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au