মেলবোর্ন, ২১ ডিসেম্বর- ইসলাম ‘ধর্ম অবমাননা’র কথিত অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাস নামের যে যুবককে বিবস্ত্র করে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেই ঘটনার নতুন একটি ভিডিও ফুটেজ সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে- পুলিশ হেফাজতে থাকা দীপুকে কে বা করা ‘তৌহিদী জনতা’র হাতে তুলে দিয়েছিল?
যদিও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) আজ শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছে, ময়মনসিংহের ভালুকার ওই পোশাক কারখানার ফ্লোর ম্যানেজার প্রথমে দীপু দাসকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করে। এরপর তিনিই উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেন দীপুকে।
গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ভালুকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানির শ্রমিক দীপু দাসকে (২৮) ‘ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রথমে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে বিবস্ত্র করে রাস্তার পাশের একটি গাছে গলায় রশি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখার পর পুড়িয়ে হত্যা করে ’তৌহিদী জনতা’।
ভিডিও ফুটেজে কী দেখা যাচ্ছে
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ঘটনার একটি নতুন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নিহত দীপু চন্দ্র দাস কোনো একটি ভবনের রুমে সোফায় বসে আছেন। তার আশেপাশে কমপক্ষে দুইজন পুলিশকে দেখা যাচ্ছে। ছিল সাদা পোশাকের একজন ব্যক্তিও। দীপুকে সেই পুলিশ সদস্যদের কাছে কাকুতি মিনতি করে কিছু বলতে (কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না) দেখা যাচ্ছে।
ওই ভিডিও ফুটেজে আরও দেখা যাচ্ছে, সুউচ্চ ওই ভবনের বাইরে বেশ কিছু মানুষ উত্তেজিত অবস্থায় ঘুরাফেরা করছে এদের কেউ কেউ চিৎকার করে দপিুকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলছে।
এ বিষয়টি ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মালেকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকরা। কিন্তু তিনি এ নিয়ে কিছু বলতে চাননি।
ভিন্ন কথা বলছে র্যাব-১৪
তবে র্যাব-১৪ এর পরিচালক নাইমুল হাসান শনিবার সংবাদ সম্মেলনে ভিন্ন কথা বলেছেন। তার দাবি, ফ্লোর ম্যানেজার আলমগীর হোসেন মবের হাতে দীপু দাসকে তুলে দেন। এই অপরাধে তাকেসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দীপু দাসের কী কথায় ধর্ম অবমাননা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে নাইমুল হাসান বলেন, ‘আমরা বার বার চেষ্টা করেছি জানতে, দীপু দাস কাকে বলেছে? কী বলেছে- এটা কিন্তু কেউ বলতে পারেনি।’
“আমার মনে হয়, উত্তেজিত জনতা কিংবা পূর্বের কোনো শত্রুতা ছিল কিনা সেটাও তদন্ত করে দেখব।”

দীপু দাসকে গাছে ঝুলিয়ে আগুন দিচ্ছে ‘তৌহিদী জনতা’। ছবি: সংগ্রহীত।
আসল ঘটনা প্রমোশন নিয়ে দ্বন্দ্ব
দীপু চন্দ্র দাস চাকরি করতো পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানি নামে একটি পোশাক কারখানায়। কিছুদিন আগে নিজের যোগ্যতায় কারখানাটির সুপারভাইজার পদে প্রমোশন পান তিনি। তা নিয়ে অন্য তিন সহকর্মীরে সাথে দীপুর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এছাড়া পাওনা টাকা নিয়েও ওই তিনজনের সাথে বিরোধ তৈরি হয় দীপু দাসের।
সেই তিনজন সহকর্মী দীপুকে ‘শিক্ষা’ দিতে ইসলাম ‘ধর্ম অবমাননা’র মিথ্যে অভিযোগ আনে। এবং কারখানার পাশেই মব সৃষ্টি করে দীপু দাসকে প্রথমে পিটিয়ে আধমরা করে। পরে জ্যান্ত অবস্থায় গলায় দড়ি বেঁধে গাছের সাথে ঝুলিয়ে সেই আধমরা দেহটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
দীপুকে যখন এমন নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয়, তখন কয়েকশ মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য ভিডিও করতে থাকে। কিন্তু তাদের কেউ দীপু দাসকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি।
‘দীপু দাস’ নামের ভুয়া আইডি
কারখানায় কর্মরত বেশ কয়েকজন শ্রমিক জানিয়েছে, দীপু দাস স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতো না। সে সাধারণ একটা বাটন ফোন ব্যবহার করতো।
শুধুমাত্র ‘দীপু দাস’ নামের একটি ভুয়া আইডির পোস্ট দেখে কোনো যাচাই-বাছাই না করেই তার সহকর্মীরা দীপু দাসকে এভাবে হত্যা করে।

শিল্পীর তুলিতে দীপু দাসকে হত্যার মুহূর্ত। ছবি: সংগ্রহীত