হাদির মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় রাতভর বিক্ষোভ, অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন,২১ ডিসেম্বর- বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীতে দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয় এবং ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ভবনে একদল হামলাকারী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। এর পরদিন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পার হলেও এখনও কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ বলছে, জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত চলছে।
হামলা ও অগ্নিসংযোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর কার্যক্রম এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীর স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পরিকল্পিত ও সংগঠিতভাবে এই হামলাগুলো চালানো হয়েছে।

হামলার কারণে শুক্রবার প্রথম আলো পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠার ২৭ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম সংবাদপত্রের ছুটির বাইরে প্রথম আলোর মুদ্রিত সংস্করণ বন্ধ ছিল। একই সঙ্গে প্রায় ১৭ ঘণ্টা বন্ধ ছিল পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণও। শনিবার থেকে সীমিত পরিসরে আবার প্রকাশ শুরু করেছে প্রথম আলো।
একই পরিস্থিতির মুখে পড়ে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারও। হামলার পর শুক্রবার তারা পত্রিকা প্রকাশ করতে পারেনি। অনলাইন সংস্করণও দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। কর্তৃপক্ষ জানায়, ৩৩ বছরের ইতিহাসে সংবাদপত্রের ছুটি ছাড়া এই প্রথম তাদের প্রকাশনা বন্ধ রাখতে হয়েছে। হামলার সময় ডেইলি স্টারের ২৮ জন সাংবাদিক ও কর্মী ভবনের ছাদে আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন।

ছায়ানটে হামলা ও ভাংচুর। ছবি: সংগৃহীত
গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলার তদন্ত বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, দুটি গণমাধ্যমে হামলার ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। তবে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণসহ অন্যান্য উপায়ে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে।
শনিবার সকালে ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম আলো কার্যালয় পরিদর্শন করেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। ভবনের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখার পর মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ঘোষণা দিয়েই এই হামলা চালানো হয়েছে। কিছু মানুষ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও হামলা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অতীতেও প্রথম আলোর সামনে বিক্ষোভ ও সহিংস ঘটনার পর কয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
হামলার পর থেকে ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সীমিত আকারে প্রকাশনা কার্যক্রম চালু রেখেছে।
এদিকে, দেশের শীর্ষ দুটি পত্রিকার কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় অন্যান্য গণমাধ্যমেও উদ্বেগ বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেভাবে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা হয়েছে, তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ভয়াবহ বার্তা। গণমাধ্যম সমাজের অসংগতি তুলে ধরে জনস্বার্থে কাজ করে, সেখানে হামলার কোনো যুক্তি নেই বলে মনে করছেন তারা।

সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটে হামলার ঘটনায় গতকাল শুক্রবার বিকেলে সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতসহ কয়েকটি গান গেয়ে প্রতিবাদ জানান নালন্দা ও ছায়ানট বিদ্যায়তনের বর্তমান-প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংস্কৃতিকর্মীরা -সমকাল
নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জাতীয় দৈনিক কালবেলা ও সমকালের কার্যালয়ের সামনে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেখানে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
গণমাধ্যমে হামলার ঘটনায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, যেভাবে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, তাতে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। তিনি বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতেই পরিকল্পিতভাবে গণমাধ্যমের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে শনিবার সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডে বিক্ষোভ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে সংগঠনটি। বিক্ষোভ মিছিলটি পল্টন মোড় থেকে শুরু হয়ে উদীচী কার্যালয়ের সামনে সত্যেন সেন স্কয়ারে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে নেতাকর্মীরা হামলাকে মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর সরাসরি আঘাত বলে উল্লেখ করেন।
সমাবেশে উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, হুমকি থাকার পরও উদীচীর নিরাপত্তায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলার পর থেকেই উদীচীকে লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়েই শুক্রবার নির্বিঘ্নে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই হামলাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে এটি একটি আঘাত। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ওপর আক্রমণের মাধ্যমে শিল্প ও মানবিক চর্চা দমন করার চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। উদীচীর কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় রবিবার মামলা দায়ের করা হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ছয়তলা ভবনের প্রতিটি তলায় ভাঙচুর চালানো হয়। নিচতলায় অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের সিসিটিভি ক্যামেরা, কম্পিউটার, আসবাব ও বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলা হয়। হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার ও তানপুরাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু ল্যাপটপ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম লুটের অভিযোগও রয়েছে।
ছায়ানট কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় মামলা করেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা হয়েছে। প্রযুক্তির সহায়তায় হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।