ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিএনপি–জামায়াত সংঘর্ষ, নিহত ১
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ পড়ানোর ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে…
মেলবোর্ন ২৩ ডিসেম্বর: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কৃষি উন্নয়নের সাফল্যের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়িয়েছিল। ২০০০ সালের পর থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য কমানোর প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ২০১৩ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেখানে ছিল ১.২ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ১.০৩ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাসের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে কৃষি খাত থেকে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ সত্ত্বেও ১৯৭২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে খাদ্যশস্য উৎপাদন তিনগুণ বেড়ে ৯.৮ মিলিয়ন টন থেকে ৩৪.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছায়। এর ফলে বাংলাদেশ প্রায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে জিএনআইয়ের তুলনায় বৈদেশিক সাহায্যের হার ১৯৭৭ সালের ৮ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে এক শতাংশের নিচে নেমে আসে। পোশাক খাতনির্ভর রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের জোরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একসময় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ছাড়িয়ে যায়।
এই আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিতেই সরকার হাতে নেয় একের পর এক মেগা প্রকল্প—বৃহৎ সেতু, গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল, মহাসড়ক, বিমানবন্দর আধুনিকীকরণ, এমনকি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
কিন্তু এরপরই আসে দুর্নীতির ‘প্লাবন’ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তির ভয়াবহ ক্ষয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে উন্নয়নের সাফল্যের প্রচার চালালেও অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত দখল, স্বজনপ্রীতি, ক্রোনি ক্যাপিটালিজম ও প্রকাশ্য লুটপাটের মাধ্যমে দেশকে শূন্য করে দেয়। সরকারি চাকরিতে দলীয় কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণ সমাজকে বঞ্চিত করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলনের বিস্ফোরণে রূপ নেয়।
এই আন্দোলনের ফলেই ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার সরকার এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দেশজুড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে এবং মানুষ আশাবাদী হয় যে একজন আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।
কিন্তু অধ্যাপক ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন তা ছিল ভয়াবহ—রাজনৈতিকভাবে ভঙ্গুর রাষ্ট্র, শূন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং রাজনৈতিক ঋণে জর্জরিত ব্যাংকিং খাত। তিনি আর্থিক খাত স্থিতিশীল করা এবং সংবিধান ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ওপর জোর দেন। দক্ষ অর্থনীতিবিদদের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় কিছুটা আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে—এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন।
শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ কমে যাওয়া ছিল আরেকটি বড় ধাক্কা। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ১.৬৯ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা ইউনেসকোর সুপারিশের অনেক নিচে এবং দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন। একজন অধ্যাপক ও নোবেল বিজয়ীর কাছ থেকে মানুষ ঠিক উল্টোটা প্রত্যাশা করেছিল।
ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। রাজনৈতিক কারণে কারখানা বন্ধ, বেকারত্ব বৃদ্ধি, শ্রম আইন বিষয়ে যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই আন্তর্জাতিক চাপে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। একই সঙ্গে জমি দখল, চাঁদাবাজি, পুলিশি হয়রানি, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ।
সমস্যা হলো—যে আন্দোলনের মাধ্যমে আগের সরকার উৎখাত হয়েছিল, তার মূল দাবি ছিল সুশাসন, চাকরি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। সংস্কার তখন মানুষের এজেন্ডায় ছিল না। সংস্কার প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু সুশাসন ছাড়া তা অর্থহীন।
অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক খাত কিছুটা সামাল দিতে পারলেও অর্থনীতি ঠিক করতে পারেনি। কৃষি প্রবৃদ্ধি এখনো টিকে আছে, রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও দারিদ্র্য আবার বাড়ছে। দেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নিম্নমুখী স্রোতে পড়েছে।
এর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো—মানুষ বিকল্প খুঁজছে। অনেকেই ইসলামপন্থী দলগুলোর দিকে ঝুঁকছে, কারণ তারা এখনো ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতির দায়ে কলুষিত হয়নি। আবার বিএনপিও বড় জয়ের আশা করছে, যদিও তাদের অতীতও দুর্নীতি ও সহিংসতার অভিযোগে ভরা।
ফলে দেশ দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন দ্বন্দ্বে—একদিকে ‘সুশাসনের আশা’, অন্যদিকে ‘বাঙালি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সুরক্ষা’। কোনটি জয়ী হবে, তা নির্ভর করছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ওপর। তবে যেদিকেই পাল্লা ভারী হোক, আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে—শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষই।
(লেখক বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাবেক চিফ অব পলিসি অ্যাসিস্ট্যান্স ব্রাঞ্চ)
২২ ডিসেম্বর আইপিএস (জাতিসংঘ ব্যুরো)–এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে GlobalIssues.org–এ প্রকাশিত।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au