ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিএনপি–জামায়াত সংঘর্ষ, নিহত ১
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ পড়ানোর ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে…
মেলবোর্ন ২৩ ডিসেম্বর: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর-পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের মাত্র কয়েক দিন আগে-একটি গোপন মার্কিন প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে, দক্ষিণ এশিয়ার নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশে ভবিষ্যতে চরমপন্থা, উগ্রবাদ ও সহিংসতার প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। অর্ধশতাব্দী পরে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অরাজক পরিস্থিতি সেই ভবিষ্যদ্বাণীকেই যেন বাস্তব করে তুলছে।
গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে সংঘটিত ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে-দেশটি দ্রুত নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
সর্বশেষ সহিংসতার সূত্রপাত হয় ১২ ডিসেম্বর যুব নেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর। মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হাদি ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী অস্থিরতার মধ্য দিয়ে উঠে আসা এক উগ্র রাজনৈতিক মুখ, যিনি বিশেষ করে ভারতবিরোধী কড়া বক্তব্যের জন্য পরিচিত ছিলেন।
ওসমান হাদি ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ ধারণার সমর্থক ছিলেন-যা মূলত কিছু ভারতবিরোধী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কল্পনাপ্রসূত রাজনৈতিক স্বপ্ন। এই বাস্তবতা ২০২৪ সালের আন্দোলনকে ‘স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আন্দোলন’ বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বরং এটি স্পষ্ট করে যে ওই অস্থিরতায় উগ্রপন্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে দেশটি ক্রমেই ইসলামপন্থী চরমপন্থীদের প্রভাববলয়ে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস প্রকাশ্যেই ভারতের বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন, দাবি করেছেন যে ভারত নাকি ২০২৪ সালের আন্দোলনকে সমর্থন করেনি। সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে ভারতকে দায়ী করার প্রবণতাও স্পষ্ট-হাদির হত্যাকারীদের ভারত থেকে গ্রেপ্তার করে হস্তান্তরের দাবি তোলা হয়েছে, যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশ এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পায়নি।
এই অবস্থান গত দুই দশক ধরে বিদ্যমান ভারত–বাংলাদেশের সুসম্পর্কে ফাটল ধরাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার যেন আগের সরকার পতনে ভূমিকা রাখা ভারতবিরোধী উগ্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে নিজেদের ‘যোগ্যতা’ প্রমাণ করতেই বেশি আগ্রহী। এর ফলেই হাদির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে-যা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের জন্য গভীর হুমকি।
এই প্রবণতা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ওপরও অশনি ছায়া ফেলছে। অন্তর্বর্তী সরকার বাহ্যিকভাবেও নিজেদের ‘অ্যান্টি-হাসিনা’ অবস্থান জোরালো করতে গিয়ে ভারতবিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না-বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দেওয়ার পুরোনো ইতিহাস মাথায় রাখলে।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর থেকে ভারতীয় সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি বাংলাদেশকে ‘কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে-বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই মূল্যায়ন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে; এটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিসীম সম্ভাবনা বহন করে। কিন্তু প্রতিবেশীকে ‘হাজার ক্ষতে রক্তাক্ত করার’ নীতিতে এগোলে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হবে।
ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ আজ এমন এক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও বহুত্ববাদী মূল্যবোধই হামলার লক্ষ্য হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচন তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-এটি শুধু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিচয় নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যও নির্ধারণ করবে।
লেখক: শুভদীপ ভট্টাচার্য, একজন ফ্রিল্যান্স একাডেমিক ও গবেষক। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পররাষ্ট্রনীতি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া বিষয়ক (এরিয়া স্টাডিজ) উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি কলকাতার Asia in Global Affairs (AGA)-এর সঙ্গে অ্যাডজাঙ্ক্ট রিসার্চার হিসেবে যুক্ত। এর আগে তিনি ভারত সরকারের অধীন স্বায়ত্তশাসিত মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজ (MAKAIAS)-এ ফেলো এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীন নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ (NIAS)-এ রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন।
২৩ ডিসেম্বর India Narrative–এ প্রকাশিত
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au