বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে
মেলবোর্ন, ৩০ এপ্রিল- ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ আরোপের সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ঘিরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। গত বুধবার আন্তর্জাতিক…
মেলবোর্ন, ৩০ এপ্রিল- সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই পদক্ষেপকে ‘চমৎকার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে এবং তেল ও পেট্রলের দাম কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত তা প্রশমনে সহায়ক হতে পারে। তাঁর ভাষায়, শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ তেল ও পেট্রলের দাম কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং ভোক্তারা তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি পেতে পারেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সাম্প্রতিক যোগাযোগে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে চলমান বিরোধ নিরসনে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে মস্কো সহযোগিতা করতে চায় বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
বুধবার প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এক টেলিফোন আলাপে ট্রাম্প ও পুতিন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করেন। ট্রাম্প বলেন, পুতিন তাঁকে জানিয়েছেন যে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে তিনি যুক্ত হয়ে সমাধান খুঁজতে সহায়তা করতে চান। তবে ট্রাম্প জবাবে পুতিনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার আগে তাঁর নিজের চলমান যুদ্ধ শেষ করা উচিত।
এই আলোচনায় ইউক্রেন সংকট নিয়েও কথা হয়েছে বলে জানা গেছে। ট্রাম্প দাবি করেন, পুতিনের সঙ্গে তাঁর আলোচনা ‘খুবই ফলপ্রসূ’ হয়েছে এবং ইউক্রেন সংঘাতের একটি সমাধান দ্রুতই আসতে পারে। অন্যদিকে ক্রেমলিন জানিয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি বার্ষিকী উপলক্ষে আগামী মাসে ইউক্রেনে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন পুতিন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার আরেকটি দিক হলো সাম্প্রতিক নৌ অভিযানের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী একটি ইরানি কনটেইনারবাহী জাহাজ জব্দ করার পর সেখানে থাকা ছয়জন ক্রুকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং তারা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরেছেন। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ‘তউসকা’ নামের ওই জাহাজের আরও ২২ জন ক্রু এখনও আটক রয়েছেন এবং তাদের মুক্তির চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে চলমান নৌ অবরোধের মধ্যে জাহাজটিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশ অমান্য করায় সেটি জব্দ করা হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইরান ইস্যুতে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জন গারামেন্ডি হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে ইরান যুদ্ধের কৌশলগত দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এই যুদ্ধে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, শত শত আহত এবং হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর মতে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘নিজের ওপর নিজের গুরুতর আঘাত’।
গারামেন্ডি আরও অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল, কিন্তু প্রশাসন এ বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি এই যুদ্ধকৌশলকে ‘চরম অযোগ্যতা’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ইরানের সরকার এখনো টিকে আছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অক্ষত রয়েছে। বরং এই সংঘাত ইরানের সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে।
তবে এই সমালোচনার জবাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গারামেন্ডির বক্তব্যকে ‘বেপরোয়া’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি ব্যক্তিগত বিরূপ মনোভাব থেকেই এমন মন্তব্য করা হচ্ছে এবং এ ধরনের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের প্রচারণায় সুবিধা করে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ওপেক থেকে আমিরাতের সরে দাঁড়ানো এবং অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্রঃ মিডল ইস্ট আই ও বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au