অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনে বড় পরিবর্তন, ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে শীর্ষে ভারত। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ এপ্রিল- অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনের উৎসে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩২ শতাংশই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। এই হার দেশটির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এত উচ্চ অনুপাত সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ১৮৯১ সালে। তখন দেশটিতে স্বর্ণখনি-পরবর্তী সময়ে ব্যাপক অভিবাসন হয়েছিল।
নতুন পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসীদের প্রধান উৎস দেশ হিসেবে ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে গেছে ভারত। ২০২৫ সালে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হয়েছে। মোট ৮৮ লাখ ৩০ হাজার বিদেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষের মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৭১ হাজার ২০ জনই ভারতের নাগরিক। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৫০ জন, যা খুব সামান্য ব্যবধানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এই পরিবর্তন অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন প্রবণতায় একটি বড় মোড় নির্দেশ করছে।
গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৭৬ লাখ। ২০১৫ সালে যেখানে জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩৮ লাখ, সেখানে এক দশকে তা বেড়েছে প্রায় ৩৮ লাখ। এই বৃদ্ধির পেছনে অভিবাসনের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের অনুপাত ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে এখন ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এই হার একসময় ১৯৪৭ সালে নেমে এসেছিল মাত্র ৯ দশমিক ৮ শতাংশে, তবে এরপর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিদেশে জন্ম নেওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভারতের পরেই রয়েছে ইংল্যান্ড, আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন থেকে আসা প্রায় ৭ লাখ ৩২ হাজার মানুষ। এরপর রয়েছে নিউজিল্যান্ড, যেখান থেকে আগত মানুষের সংখ্যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৩৮ হাজারে। ফিলিপাইন থেকে আগত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ১২ হাজার ৫৩০, যা ২০১৫ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়া থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন।
অন্যদিকে, ইতালি ও ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ২০১৫ সালের পর থেকে সবচেয়ে বেশি কমেছে। এই দুই গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যম বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এসব দেশ থেকে ব্যাপক হারে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনের প্রতিফলন। বর্তমানে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের মধ্যম বয়স ৪৩ বছর, যা ২০০৫ সালের ৪৬ বছর থেকে কমেছে। তুলনামূলকভাবে অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া মানুষের মধ্যম বয়স বেড়ে এখন ৩৫ বছরে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাপী অভিবাসীর সংখ্যার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান এখন অষ্টম। সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক অভিবাসী রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে ৫ কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করছে। অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০২৫-২৬ সময়পর্বে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার মানুষকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যাদের বেশিরভাগই দক্ষ কর্মী হিসেবে আসবেন। একই সময়ে মোট নিট অভিবাসনের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা মহামারির পর সর্বোচ্চ সময়ের তুলনায় কিছুটা কম।
অভিবাসন ইস্যুতে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতেও তীব্র আলোচনা চলছে। দেশটির অভিবাসনমন্ত্রী টনি বুর্ক বলেছেন, আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার মূল শক্তিই হচ্ছে এর বহুসাংস্কৃতিক সমাজব্যবস্থা। অন্যদিকে বিরোধী নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর অভিবাসনের সংখ্যা কমানোর ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, দেশের জীবনধারা রক্ষায় অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
আগামী বছরগুলোতে অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ সময়পর্বে জনসংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়তে পারে এবং ২০৩৫-৩৬ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৩ কোটি ১৫ লাখে পৌঁছাবে। বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসনের এই পরিবর্তিত ধারা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
সূত্রঃ সিবিএস নিউজ