বাংলাদেশ

কেন মানুষ ভুলতে পারেনি সেই ‘হাওয়া ভবনের’ নাম

  • 3:34 pm - December 25, 2025
  • পঠিত হয়েছে:২০২ বার
ছবি : সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৫ ডিসেম্বর- বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা বনানীর ১৩ নম্বর রোডের ‘ডি’ ব্লকে অবস্থিত ৫৩ নম্বর বাড়ি। যার নাম ছিল ‘হাওয়া ভবন’। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় গেলে এই বাড়িটি মানুষের আলোচনা ও কৌতুহলের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

খালেদা জিয়ার সেই সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত হাওয়া ভবন ‘বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র’ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল। সেই সময়ে বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক তারেক রহমানের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য হাওয়া ভবনের নাম ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে।

মূলত বিএনপি সরকারের পুরো সময়জুড়ে তারেক রহমানের আড্ডাস্থলের নাম ছিল হাওয়া ভবন। তাই সাধারণ মানুষ যেমন ভোলেনি আলোচিত সেই হাওয়া ভবনের কথা। তেমনি ভোলেননি খোদ বিএনপির নেতাকর্মীরাও। দলটির একটি অংশ আজও মনে করে হাওয়া ভবনই সব নষ্টের মূল! বিএনপির সব অর্জন ম্লান করে দিয়েছিল এই হাওয়া ভবন।

সেই হাওয়া ভবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে OTN Bangla-কে ঢাকা মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, হাওয়া ভবনটি বিএনপির অনেক অর্জনকেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল। বিএনপি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে তারুণ্যের অহংকার বলা হলেও তিনিই দলটির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন। আর সেই খেসারত এখনো দিতে হচ্ছে দলটিকে।

বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অনেক নেতাকর্মীও হাওয়া ভবনের বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ছাত্রদল নেতা বলেন, ‘হাওয়া ভবন ছিল বিএনপির জন্য আত্মঘাতী। দেশের প্রতিটি স্তরে একটি মাত্র ভবনের নিয়ন্ত্রণ অনেক কিছুই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে’।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষে চাকরিরত একজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি তিন বার বিসিএস পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়েছিলেন। কিন্তু তারেক রহমানের হাওয়া ভবন থেকে সবুজ সংকেত না পাওয়ায় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাননি।

তিনি দাবি করেন, ‘এতোটা ন্যাক্কারজনকভাবে হাওয়া ভবন থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা হতো। যা কল্পনাতীত।’

বিএনপির রাজনীতিতে হাওয়া ভবন এক বিব্রতকর নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেউ আলোচনা করতে গেলে তারা বিব্রত হয়ে মৃদুকণ্ঠে বলেন, বিষয়টি এখন অতীত। এটা নিয়ে আর আলোচনা না করাটাই ভালো। এভাবে তারা এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু বিএনপি চাইলেই তো হবে না। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বারবার মনে করিয়ে দেয় সেই হাওয়া ভবনের কথা।

২০০১ সালের নির্বাচনের আগেই বিএনপির দলীয় কার্যালয় থাকার চেয়ারপারসনের কার্যালয় হিসেবে বনানীতে হাওয়া ভবন ভাড়া নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে বহু বিতর্ক সৃষ্টি করেন তারেক রহমান। নির্বাচনের পরও ওই কার্যালয় চালু রাখায় বিতর্ক আরো বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে নানা দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ে।

এক-এগারোর পর সমঝোতার মাধ্যমে তারেক রহমান বিদেশে চলে যাওয়ায় ওই কার্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দলের অনেকে আড়ালে হাওয়া ভবনের ভূমিকাকে দায়ী করেন।

১৯৯৭ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির সদস্য পদ নিয়ে রাজনীতিতে নাম লেখান জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। এরপর প্রথমে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং সর্বশেষ কাউন্সিলে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের পদ লাভ করেন তিনি। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তারেক রহমান হাওয়া ভবন থেকে নির্বাচনী জরিপ ও দলীয় মনোনয়ন প্রদানসহ নানামুখি সাংগঠনিক তৎপরতা পরিচালনা করায় সারাদেশে তা পরিচিতি লাভ করে।

সেই নির্বাচনে জয়লাভের পর ওই চক্রটি তারেক রহমানকে সামনে রেখে হাওয়া ভবনকে প্যারালাল সরকার পরিচালনার উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের বিকল্প একটি কার্যালয়ে পরিণত হয় হাওয়া ভবন। এর মাধ্যমে তারেক রহমান বিগত সরকার ও বিএনপির ভেতর একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আসলে হাওয়া ভবনকে প্রতিষ্ঠিত করাই হয় বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে।

সেই ভবনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের কিছু তরুণ মন্ত্রী-এমপির সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় আলাদা মন্ত্রিসভা।এই মন্ত্রিসভার সদস্যরা তারেক রহমানকে আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রচার করতে থাকেন। এভাবেই তারেক রহমানকে প্রদীপের আলোয় নিয়ে আসা হয়।

মুগ্ধ তারেক রহমানও এদের পুরস্কৃত করেন একেকজনকে একেক সেক্টরের দায়িত্ব দিয়ে।এরমধ্যে তার মূল ব্যবসা দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া হয় তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে। অর্থাৎ তিনি ‘অর্থমন্ত্রী’। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও প্রশাসনে দলীয় লোক নিয়োগের দায়িত্ব দেয়া হয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল ইসলাম বকুলকে। সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পায় আশিক ইসলাম।

আবার হাওয়া ভবনের প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদ দেয়া হয় জয়কে। আরেক ছাত্রদল নেতা মিয়া নুরুদ্দিন অপুকে করা হয় ব্যক্তিগত সহকারি বা এপিএস। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সার্বিক খোঁজ খবর তারেককে পৌঁছে দেয়ার জন্য সাবেক ছাত্রদল নেতা ডা. ফিরোজ মাহমুদ ইকবালকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

এসব কর্মকর্তারা বিএনপি সরকারের সেই পাঁচ বছরে তারেক রহমানের পাশাপাশি হাওয়া ভবনের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেন। একেবারে শূন্য থেকে শত থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যায় অনেকে।

এদের নানারকম অভিযোগ পেলেও মোটেও সেগুলো আমলে নিতেন না তারেক রহমান। উল্টো তার প্রশ্রয়ে এরা ধরাকে সরা জ্ঞান করেছে। নিজেরা পরিণত হয়েছে টাকার কুমিরে। পরবর্তীতে এই হাওয়া ভবনই বিএনপির জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায়। যার খেসারত আজও দিতে হচ্ছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে।

এই শাখার আরও খবর

তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করল পিবিআই

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর সঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটানো ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের…

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে চলছে ট্রাম্প-ওবামার কথার লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারের শেষ সময়ে এসে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে শুরু হয়েছে খাবারের রেস্তোরাঁ নিয়ে পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই।…

‘৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃত স্বাধীনতা এখনো আসেনি’: ফজলুর রহমান

বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পক্ষে আজীবন সোচ্চার ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের স্মরণসভায় বিএনপির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেছেন, ১৯৭১ সালে…

ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহুর তৎপরতা, বিকল্প সরকার গঠনে বিরোধীদের বৈঠক

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ভোট গণনা শেষ হলেও নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন কোনো পক্ষই…

কানাডায় স্থায়ী বসবাসের বড় সুযোগ, যাদের মিলছে অগ্রাধিকার

কানাডায় স্থায়ী বসবাসের (পিআর) সুযোগ পেতে ফরাসি ভাষায় দক্ষ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশটির এক্সপ্রেস এন্ট্রি ব্যবস্থায় চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ফরাসিভাষী…

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা, তিন বছর পর ঢাকায় এসেছিলেন কিসিঞ্জার

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন, গণহত্যার প্রতিবাদ জানানো মার্কিন কূটনীতিকদের উপেক্ষা এবং বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্তের কারণে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au