আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ২৯ ডিসেম্বর- বাংলাদেশে গত ছয় মাসে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে অন্তত ৭১টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে, যার বড় অংশই হিন্দু ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘটেছে। জুন থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালের এসব ঘটনার একটি অভিন্ন ধারা রয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (এইচআরসিবিএম)। সংগঠনটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দেশজুড়ে একটি ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত সহিংসতার ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০টিরও বেশি জেলায় এসব ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে রংপুর, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ, খুলনা, কুমিল্লা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও সিলেট। উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকা জুড়ে ঘটনার বিস্তার থাকায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি স্থানীয় কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের একটি সংকট।
এইচআরসিবিএম জানায়, অধিকাংশ ঘটনায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগের সূত্রপাত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট বা স্থানীয় গুজব থেকে। এরপর দ্রুত পুলিশি পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যার পরপরই উত্তেজিত জনতার সমাবেশ ঘটে এবং হামলা ছড়িয়ে পড়ে অভিযোগের বাইরে থাকা সাধারণ হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপরও। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হওয়ার পরও আশপাশের হিন্দু পাড়ায় হামলা চালানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় একক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পুরো সম্প্রদায়কে শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। বহু ঘটনায় হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে, মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আতঙ্কে পরিবারগুলো এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সহিংসতার শিকারদের বড় অংশই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ, যাদের পক্ষে নিজেদের রক্ষা করা বা আইনি সহায়তা নেওয়া কঠিন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কয়েকটি ঘটনায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯ জুন ২০২৫ বরিশালে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ২২ বছর বয়সী এক যুবককে গ্রেপ্তারের পর আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যেই চাঁদপুরেও একই ধরনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২৭ জুলাই ২০২৫ রংপুরের বেতগাড়ি ইউনিয়নে। সেখানে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে গ্রেপ্তারের পর অন্তত ২২টি হিন্দু পরিবারের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। এতে বহু পরিবার ঘরছাড়া হয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব ঘটনায় কিশোররা ক্রমেই দ্বিমুখী ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। তারা একদিকে অভিযুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার শিকারও হচ্ছে।
এইচআরসিবিএম জানায়, নথিভুক্ত ৭১টি ঘটনার মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি ঘটনায় অভিযুক্ত বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হিন্দু। এদের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরও রয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশি মামলা, এজাহার, জনতার হামলা, সম্পত্তি ধ্বংস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার বা সাময়িক বরখাস্ত এবং জনতার হামলায় মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বহু অভিযোগের উৎস ছিল ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ করা পোস্ট নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, কোথাও অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার দাবি উঠেছে, আবার কোথাও ফরেনসিকভাবে পোস্টের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবুও জনচাপের মুখে অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সাইবার সিকিউরিটি আইনে মামলা হয়েছে এবং এতে শিক্ষার্থী ও তরুণ কর্মজীবীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোও এ সংকটে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে একাধিক শিক্ষার্থীকে সাময়িক বরখাস্ত, বহিষ্কার বা পুলিশি রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এতে সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে এইচআরসিবিএম। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের পরও সহিংসতা থামেনি। পুলিশের উপস্থিতি বা পূর্বসম্পৃক্ততার পরও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হামলা হয়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়, যা হামলাকারীদের আরও উৎসাহিত করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকটি ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটেছে। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ৩০ বছর বয়সী এক হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরে তার মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। এর আগে খুলনায় এক কিশোরকে প্রকাশ্যে মারধরের পর হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।
এই হত্যাকাণ্ডগুলো বাংলাদেশে এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিগুলোর মধ্যে প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরদারি বাড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইনে অভিযোগ, দ্রুত গ্রেপ্তার, জনতার সংগঠিত হওয়া এবং হিন্দু এলাকায় হামলার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ক্রমেই ভয় দেখানো ও নির্যাতনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, স্বাধীন তদন্ত ও কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা না থাকলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন ও নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
প্রতিবেদনের এই তথ্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গেও মিল রয়েছে। নয়াদিল্লি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি, মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হাজারো ঘটনার তথ্য সামনে এসেছে, যা বিষয়টিকে আঞ্চলিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
সূত্রঃ ভয়েজ অব দ্য ন্যাশন অর্গানাইজার
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au