জামায়াতের সঙ্গে জোটে অস্বস্তি, এনসিপির নারী নেতৃত্বের বড় অংশ ক্ষুব্ধ । ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৯ ডিসেম্বর- জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির ভেতরে তীব্র অস্বস্তি প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা নারী নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দল ছাড়ছেন, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন বা দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া এনসিপির জন্য পরিস্থিতি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
সবচেয়ে আগে জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে পদত্যাগ করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর দল ছাড়ার ঘোষণা দেন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। তিনি জানান, আপাতত নির্বাচন করবেন না, তবে রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না। একই ধারাবাহিকতায় দল থেকে পদত্যাগ না করলেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। অন্যদিকে আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বলে মন্তব্য করেছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন।
দলীয় সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় দলের শীর্ষ ছয় নারী নেত্রী বৈঠকে বসেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সামান্থা শারমিন, মনিরা শারমিন, নুসরাত তাবাসসুম, তাজনূভা জাবীন, তাসনিম জারা এবং নাহিদা সারোয়ার নিভা। ওই বৈঠকে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া জামায়াত এনসিপি আসন সমঝোতা নিয়ে তারা সরাসরি আপত্তি জানান। বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে একযোগে পদত্যাগের কথাও তোলা হয়। তারা বিকল্প হিসেবে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা অথবা এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে মত দেন।
এর আগের দিন শনিবার জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে নাহিদ ইসলামের কাছে একটি চিঠি দেন এনসিপির ৩০ জন নেতা। চিঠিতে দলের ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, জামায়াত এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এনসিপির নারী নেত্রীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত চরিত্র হননের চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সেই সময়কার অপরাধ নিয়ে তাদের অবস্থানকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এনসিপির ভেতরের কয়েকজন নেতা মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে ভবিষ্যতে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে। এর মধ্যেই গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে শনিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তাসনিম জারা লেখেন, তিনি দল ছাড়ছেন। এর আগে তিনি দলীয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও বিষয়টি জানান। যদিও পদত্যাগের নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। দলীয় সূত্রের দাবি, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোটই তার সরে দাঁড়ানোর মূল কারণ। জানা গেছে, তিনি ঢাকা ৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং ইতোমধ্যে ভোটারদের স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করেছেন।
রোববার সকালে পদত্যাগের ঘোষণা দেন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, এনসিপি ছাড়লেও রাজনীতি ছাড়ছেন না। ঢাকা ১৭ আসন থেকে এনসিপির প্রার্থী হওয়ার কথা থাকলেও তিনি নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে মনিরা শারমিন দল ছাড়েননি, তবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। রোববার সন্ধ্যায় দেওয়া ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, মধ্যপন্থি দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তিনি জানান, আপাতত পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেই, তবে এই অবস্থান তিনি মেনে নিতে পারছেন না।
নুসরাত তাবাসসুম রোববার রাত ১০টার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দেন। কুষ্টিয়া ১ আসনে এনসিপির প্রার্থী হওয়ার জন্য তিনি দলীয় মনোনয়ন কিনেছিলেন। পোস্টে তিনি লেখেন, জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটে শর্তসাপেক্ষে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মূল বক্তব্য থেকে সরে এসেছে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং মনোনয়ন নেওয়া প্রার্থীদের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রবঞ্চনা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে সামান্থা শারমিন জামায়াতের সঙ্গে জোটের ঘোর বিরোধিতা করলেও দল ছাড়েননি। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থানের দিক থেকে জামায়াতের সঙ্গে কোনো সমঝোতা এনসিপিকে বড় মূল্য দিতে বাধ্য করবে। জামায়াতের সংবাদ সম্মেলনের পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট গঠনের সময় যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, এই জোট সেই অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, কিছু আসনের বিনিময়ে দলের মূল আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে যাওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে এনসিপির গঠন প্রক্রিয়ায় নারী নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই নারীদের একে একে সরে যাওয়া নবীন দলটির জন্য বড় ধরনের হোঁচট।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, কেউ দলে থাকবেন কিনা বা নির্বাচনে অংশ নেবেন কিনা, সেটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তিনি জানান, দলের নির্বাহী পরিষদে আলোচনা করে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে কথা বলা হবে এবং তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।