পুতিনের বাসভবনে হামলার চেষ্টা করছে ইউক্রেন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ ডিসেম্বর- ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা যখন নতুন করে আলোচনায়, ঠিক সেই সময়ে শান্তির আশা আরও এক দফা ধাক্কা খেল। রাশিয়া অভিযোগ করেছে, ইউক্রেন উত্তর রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বাসভবনে ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছে। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। ইউক্রেন এ অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একে শান্তি আলোচনাকে ব্যাহত করার কৌশল হিসেবে দেখছে।
সোমবার রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই অভিযোগ তোলা হয়। একই সঙ্গে মস্কো জানায়, কথিত এই হামলার প্রেক্ষাপটে তারা শান্তি আলোচনায় নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। এ নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তীব্র কথার লড়াই শুরু হয়, যা চলমান শান্তি প্রচেষ্টার ওপর নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন জেলেনস্কি। ছবিঃ রয়টার্স
এর একদিন আগে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ অবসানের একটি চুক্তির দিকে তারা অনেকটাই এগিয়ে গেছেন, এমনকি খুব কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছেছেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, কিছু জটিল ভূখণ্ডগত বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সোমবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি সেনাবাহিনীকে ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চল পুরোপুরি দখলের অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ক্রেমলিন আবারও ইউক্রেনকে পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাস এলাকার যে অংশ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানায়।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ দাবি করেন, গত ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর ইউক্রেন ৯১টি দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে মস্কোর পশ্চিমে নভগোরোদ অঞ্চলে অবস্থিত পুতিনের বাসভবনে হামলার চেষ্টা করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সব ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং কোনো ক্ষয়ক্ষতিও হয়নি। রুশ গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে লাভরভ বলেন, এই ধরনের ‘বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের’ জবাব দেওয়া হবে এবং রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী পাল্টা হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করে রেখেছে। তিনি এ ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি
তবে লাভরভ তার বক্তব্যে অভিযোগের পক্ষে কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ দেখাননি। ঘটনাকালে পুতিন কোথায় ছিলেন, সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। লাভরভ আরও বলেন, শান্তি আলোচনা চলাকালেই এই হামলার চেষ্টা হয়েছে এবং এ কারণে রাশিয়া আলোচনায় নিজের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করবে, যদিও তারা আলোচনা থেকে সরে যাবে না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে বলেন, এটি রাশিয়ার আরেক দফা মিথ্যাচার। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেনের আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে বলেই রাশিয়া এ ধরনের নাটক তৈরি করছে। তাঁর অভিযোগ, মস্কো কিয়েভে সরকারি ভবনে হামলার জন্য পরিস্থিতি তৈরি করছে এবং শান্তি আলোচনার অগ্রযাত্রা ভণ্ডুল করাই তাদের লক্ষ্য।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, পুতিনের বাসভবনে হামলার গল্প সম্পূর্ণ সাজানো। এর উদ্দেশ্য ইউক্রেনের ওপর নতুন করে হামলার অজুহাত তৈরি করা এবং শান্তি প্রক্রিয়াকে দুর্বল করা। তিনি বিশ্ব নেতাদের এই অভিযোগের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সমালোচনা করার আহ্বান জানান।
এর মধ্যেই ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়ে গেছে শান্তি আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। যদিও ট্রাম্প বলেছেন, এটি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনি অন্তত ৫০ বছরের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চান।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, ইউক্রেনের নিরাপত্তায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে বড় ভূমিকা নিতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকবে। তবে এই বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে, কারণ রাশিয়া স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইউক্রেনে কোনো বিদেশি সেনা মোতায়েন তারা মেনে নেবে না।
বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, যার মধ্যে ২০১৪ সালে সংযুক্ত করা ক্রিমিয়াও রয়েছে। মস্কো ডোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চল নিয়ে গঠিত ডনবাস, পাশাপাশি জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলকে নিজেদের অংশ দাবি করছে, যদিও আন্তর্জাতিকভাবে এগুলো ইউক্রেনের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত।
সোমবার পুতিন আবারও স্পষ্ট করে বলেন, জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে সেনাদের অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। রাশিয়ার দিনিপার সামরিক গোষ্ঠীর কমান্ডার কর্নেল জেনারেল মিখাইল তেপলিনস্কি জানান, রুশ বাহিনী অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় শহর জাপোরিঝঝিয়া থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। পুতিন এর জবাবে বলেন, নিকট ভবিষ্যতে পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে জাপোরিঝঝিয়া মুক্ত করার অভিযান জোরদার করতে হবে।
সব মিলিয়ে, পুতিনের বাসভবনে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যা যুদ্ধ অবসানে চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগকে আরও জটিল করে তুলছে।
সূত্রঃ রয়টার্স