খালেদা জিয়ার জানাজায় জনসমুদ্র
মেলবোর্ন, ৩১ ডিসেম্বর- এ যেন মানুষের সমুদ্র। উত্তর থেকে দক্ষিণে মানুষের স্রোত। পূর্ব থেকে পশ্চিমে মানুষের ঢল। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। সারাজীবন যাদের জন্য রাজনীতি করেছেন, খালেদা জিয়ার শেষযাত্রায় সেই মানুষগুলোই যেন প্রতিদান দেওয়ার প্রতিযোগীতায় নেমেছিলেন!
সকালে এভারকেয়ার হাসপাতালের হিমঘর থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ নেওয়া হয়েছিল পুত্র তারেক রহমানের গুলশানের বাসায়। সেখানে স্বজন, দলীয় নেতাকর্মী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জাতীয় পতাকায় মোড়ানো শববাহী গাড়ি সকাল ১১টার দিকে রওনা হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উদ্দেশে। পথে লাখো মানুষের ভিড় ঠেলে ঠেলে সেই শববাহী গাড়ির দেড়ঘণ্টারও মতো সময় লেগে যায়।
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খালেদা জিয়ার মরদেহ পৌছানোর পর সাধারণ মানুষের ঢল বাড়তে বাড়তে পুরো এলাকা ছেয়ে যায়। সারদেশ থেকে আসা মানুষের ভিড় মিলেছে মানিকমিয়া এভিনিউ প্রতিটি কোণায় কোণায়।
এর আগে সকালে যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে গুলশানের বাসভবনে নেওয়ার হয়, সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মায়ের মরদেহের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াতে দেখা যায় তার বড় ছেলে তারেক রহমানকে।
আজ বুধবার সকাল ১০টা ২৭ মিনিটে বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তারেক রহমানকে কোরআন তিলাওয়াত করতে দেখা যায়। ভিডিওটি দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর আবেগের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
গত মঙ্গলবার ভোর ৬টা দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ৭৯ বছর বয়সী এ নেত্রীর দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনের অবসানে দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। শুধু বিএনপির নেতাকর্মী নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানান।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন। যার মধ্যে ছিল লিভার সংক্রান্ত জটিলতা, কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আথ্রাইটিস ও ইনফেকশনজনিত সমস্যা।
গত ২৩ নভেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এর কয়েকদিন পর ২৭ নভেম্বর তার ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দিলে কেবিন থেকে ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে’ স্থানান্তর করা হয়।
এরমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনকে অন্তত পাঁচবার যুক্তরাজ্যের হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার শারীরিক অবস্থা উপযোগী না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয় দলটির পক্ষ থেকে।
এছাড়াও কাতার আমিরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ‘কারিগরি ত্রুটি’সহ একাধিক কারণে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্যে মা খালেদা জিয়াকে দেখতে গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবারে বাংলাদেশে ফেরেন দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে ‘স্বেচ্ছা নির্বাসনে’ থাকা তারেক রহমান।
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত সমস্যা প্রকট হয় ২০২১ সালের পর থেকে। সেই বছরের মে মাসে নিজের বাসায় থাকা অবস্থাতে করোনায় আক্রান্ত হন তিনি। তখনো শ্বাসকষ্টে ভোগার কারণে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
এরপর ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। তখনো তিনি হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিলো।
এর আগে থেকেই তার হার্টে তিনটি ব্লক ছিল। একটা রিংও পরানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের জুনে পোর্টো সিস্টেমেটিক অ্যানেসটোমেসির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার লিভারের চিকিৎসাও দেয়া হয়েছে বিদেশ থেকে ডাক্তার এনে।
সর্বশেষ গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেন খালেদা জিয়া। সেখান থেকে বাসায় ফেরার পথে গাড়িতে ওঠেই অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন তিনি। এরপর আরও অসুস্থ হয়ে যান ও তার শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়ে ওঠে।
এমন পরিস্থিতিতে গত ২৩শে নভেম্বর তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, খালেদা জিয়া নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।
অসুস্থ খালেদা জিয়াকে সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে কেন নেওয়া হয়েছিলো- তা নিয়েও দলের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়। তার চিকিৎসকরাও দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
সেনাকুঞ্জের ওই অনুষ্ঠানে মিসেস জিয়াকে অনেকর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায়। সাধারণত সশস্ত্র বাহিনীর এই অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক অতিথি যোগ দিয়ে থাকেন। সেই অনুষ্ঠানে তার কাছেই ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।