মতামত

নিও–লিবারালিজম ও ধর্মীয় উগ্রবাদ: দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নড়বড়ে ভবিষ্যৎ

  • 6:20 pm - January 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৬৩ বার
জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৪ জানুয়ারি: শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে একটি অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল হিসেবে ইউনুস প্রশাসন একদিকে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে জোট গড়ে তোলে, অন্যদিকে বৈশ্বিক নয়া-উদারবাদী শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে। এই সরকারের ইসলামপন্থী মৌলবাদী শক্তির প্রতি আপসের প্রথম বড় ইঙ্গিত আসে বিতর্কিত ডানপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ (JIB)-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে।

একই সময়ে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর পরামর্শ অনুযায়ী নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। বাম ও মধ্য-বাম রাজনৈতিক দল এবং কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে প্রান্তিক করে রেখে ইউনুস সরকার ক্রমেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক রক্ষণশীলতায় ভর করা এক চরম ডানপন্থী শাসনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। সরকারের গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোতেও দলটির উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিসের মতো উগ্র ডানপন্থী সংগঠনগুলোর সঙ্গে একত্রে জামায়াত ইউনুস সরকারের সংস্কার কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়েছে, বিনিময়ে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নীতিতে ছাড় আদায় করেছে। এর ফলেই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষকের পদ বাতিল এবং নারীর অধিকার খর্বকারী নানা দাবিতে সরকারের নীরব সম্মতি দেখা গেছে।

এই জোট রাজনীতির ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল আমূল বদলে গেছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি শিথিল করার দাবি উঠেছে, আর সেই দাবিকে ঘিরে ইসলামপন্থী নেতারা ব্যাপক জনসমাবেশ সংগঠিত করছেন। একই সঙ্গে দেশের প্রধান বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক, একটি খ্যাতনামা সংগীত বিদ্যালয় এবং উদীচীর মতো প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর হামলা হয়েছে। গত ১৭ মাসে সংখ্যালঘু ধর্মীয়, জাতিগত ও মতবাদভিত্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর প্রায় ২,৫০০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এক ভয়াবহ ঘটনায় এক তরুণ হিন্দুকে পিটিয়ে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এসব ঘটনা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে ভেঙে দিয়ে সমাজকে বিপজ্জনকভাবে মেরুকরণ করছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও দেশ এক সংকটময় অবস্থায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক ভারসাম্য ফেরাতে সরকার কঠোর মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু ফল খুব একটা আসেনি। কর আদায়ে দুর্বলতা এবং ব্যাংক খাতে মূলধনের ঘাটতি বড় ঝুঁকি হয়ে আছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.২ ট্রিলিয়ন টাকায়, যা মোট ঋণের ২৪ শতাংশের বেশি। শিল্প খাতে অস্থিরতা, কারখানা বন্ধ, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারের বিশৃঙ্খলা দারিদ্র্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

সমালোচকদের মতে, ইউনুস সরকারের আইএমএফ নির্ভর সংস্কার আসলে এক নয়া-উদারবাদী পুনর্গঠনের নামান্তর। যেখানে শেখ হাসিনা সরকার রাষ্ট্রনির্ভর উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এনেছিল, সেখানে ইউনুস প্রশাসন বহির্দেশীয় প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

১৭ মাসে ইউনুস ১৪টি দেশ সফর করলেও বাংলাদেশের জেলা বা বিভাগীয় শহরগুলোতে খুব কমই গেছেন। এতে বোঝা যায়, তাঁর অগ্রাধিকার সাধারণ জনগণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক নয়া-উদারবাদী শক্তিকে সন্তুষ্ট করা। চট্টগ্রাম বন্দরে মার্স্ক গ্রুপের সহায়ক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসকে দায়িত্ব দেওয়ার চুক্তি নিয়েও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাজনৈতিক দিক থেকে ইউনুস প্রশাসন বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বাম ও মধ্য-বাম শক্তিকে দমন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই ৪ লাখের বেশি রাজনৈতিক কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং প্রায় ২০০ মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। অনেকের মতে, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘জাকার্তা মেথড’-এর পুনরাবৃত্তি।

বিশ্বের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তির উচিত এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হলেও ইউনুস কোনো সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন, যেমন মিয়ানমারের অং সান সু চি মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন এই প্রশাসনের অধীনে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়েও গভীর প্রশ্ন থেকে যায়।

লেখক: বিদিত এল. দে (Bidit L. Dey)
অনুবাদ: OTN Bangla | উৎস: Countercurrents.org

এই শাখার আরও খবর

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলারডুবি, মেয়ে নিহত মা নিখোঁজ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  পিরোজপুরে দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারডুবিতে প্রাণ গেছে আট বছরের শিশু অর্পিতা বেপারীর। এ ঘটনায় তার মা রিনা…

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au