চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ৪ জানুয়ারি: আজ (৪ জানুয়ারি) অস্ট্রেলিয়ার ABC News–এ প্রকাশিত Neelima Choahan ও S. M. Faiyaz Hossain-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে ছবি ও কিছু ভিডিও ক্লিপ সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে খবরের শুরুতেই ওয়ার্নিং নোটিফিকেশন প্রদান করা হয়েছে।
⚠️ এই প্রতিবেদনে চরম সহিংসতা ও নৃশংস ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, যা অনেক পাঠকের জন্য মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার ABC News-এর ৪ জানুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে একটি গভীর ও উদ্বেগজনক চিত্র উপস্থাপন করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ের নৃশংস সহিংসতার ঘটনা থেকে শুরু করে দেশজুড়ে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, সামাজিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা—এসব মিলিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে হাইলাইট করা হয়েছে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক তরুণ হিন্দু কর্মীর প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা ও তার দেহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া, এবং এর পরই আরও মৃত্যুর ঘটনা ও বাড়িঘরে আগুন ধরানো—এসব ঘটনার ফলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে গভীর আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ ভিডিও ও বিবরণ আন্তর্জাতিক মনোযোগও আকর্ষণ করেছে।
ABC News–এর এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বর্তমান বাস্তবতা, তাদের নিরাপত্তা সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দূরীকরণের প্রেক্ষাপট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছে। OTN Bangla এর পাঠকদের জন্য এই রিপোর্ট সেই একই তথ্যভিত্তিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনূদিত ও উপস্থাপন করা হলো।
বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এখন গভীর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কথিতভাবে মহানবী মুহাম্মদকে অপমান করার অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী এক হিন্দু যুবককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার পর দেশজুড়ে ভয় ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ঘটনার পর আরও অন্তত তিনজন হিন্দু নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ হামলাটি ঘটেছে নতুন বছরের রাতে। একই সময়ে সংখ্যালঘুদের একাধিক বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
নিহত যুবকের নাম দীপু চন্দ্র দাস। তিনি বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা এলাকার পায়োনিয়ার নিট কম্পোজিট ফ্যাক্টরিতে পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি নাকি বলেছিলেন, সব দেবতাই সমান।
দীপুর বাবা রবিলাল চন্দ্র দাস বলেন, তাঁর ছেলেকে সহকর্মীরা ঈর্ষা থেকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়েছে।
“ওরা তাকে ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে টেনে নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়,” তিনি ABC-কে বলেন।
বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানায়, এই ঘটনায় প্রথমে সাতজন এবং পরে মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার বলেছে, সহিংসতার ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দীপুর পরিবারকে আর্থিক ও কল্যাণমূলক সহায়তা দেওয়া হবে।
তবে দীপুর পরিবার বলছে, আরও অনেক কিছু করা প্রয়োজন। মরদেহ নিতে গেলে প্রথমে স্থানীয় মুসলিমরা বাধা দেয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
“আমার ছেলের শেষকৃত্যের দিন ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন,” বলেন রবিলাল।

দীপুর স্ত্রী মেঘনা রানী বলেন, তাদের ছোট মেয়ে দীপিকা এখনো জানে না যে তার বাবা মারা গেছে। (ছবি: সরবরাহকৃত)
দীপুর স্ত্রী মেঘনা রানী, সাদা শোকবস্ত্র পরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
“আমার মেয়েটা এখনও তার বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। সে জানেই না তার বাবা আর কোনো দিন ফিরবে না।”
দীপুর একমাত্র আয়েই চলত পরিবারটি। তাদের টিনের ঘরের দেয়ালে দেবদেবীর ছবির পাশে হাস্যোজ্জ্বল দীপুর একটি ছবি ঝুলছে, যা এখন গাঁদা ফুলের মালায় ঘেরা।

এই ধারাবাহিক হামলা দক্ষিণ এশিয়ার এই ভঙ্গুর অঞ্চলে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ভারত দীপুর হত্যার নিন্দা জানিয়েছে। পাকিস্তানের এক শাসকদলীয় নেতা আবার ভারতকে সতর্ক করে বলেছেন, ঢাকার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিলে পাকিস্তান কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দলের এক সদস্য সতর্ক করে বলেন, ঢাকার বিরুদ্ধে ভারতের কোনো পদক্ষেপের জবাবে পাকিস্তান কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে। (স্ক্রিনশট)
ভারতীয় সাংবাদিক দীপ হালদার, যিনি বাংলাদেশ নিয়ে দুটি বই লিখেছেন, বলেন,
“এই হত্যাকাণ্ড আইএস বা তালিবানের মতো। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকায় আইএসের পতাকা দেখা গেছে, খেলাফতের ডাক উঠেছে। হাজার হাজার হিজবুত তাহরির কর্মী পুলিশের বাধা ভেঙে মিছিল করেছে। জামায়াতে ইসলামী শরিয়া আইনে দেশ চালানোর দাবি তুলেছে।”
তার মতে,
“হিন্দু সংখ্যালঘুদের সামনে এখন তিনটি পথ—হত্যা, ধর্মান্তর অথবা দেশত্যাগ।”
এক বাংলাদেশি-অস্ট্রেলীয় ABC-কে জানান, তাঁর পরিবার বাংলাদেশে হুমকির মুখে, বাড়িঘরের অংশবিশেষ ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
“পুলিশও তেমন কিছু করতে পারে না, কারণ উগ্রবাদীদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কম,” তিনি বলেন।
পরিবার সন্ধ্যার পর বাইরে যাওয়া বন্ধ করেছে, এমনকি বিয়ের অনুষ্ঠানেও অনেক জায়গায় হিন্দু আচার পালনের অনুমতি দেওয়া হয়নি।“এটা এক ভয়ঙ্কর পরিবেশ। আমি এখানে নিরাপদ, কিন্তু ওরা বাংলাদেশে নিরাপদ নয়,” তিনি বলেন।
অমল দত্ত, অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ (AFERMB)-এর পরিচালক, ABC News–কে বলেছেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তাঁকেও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, কারণ তাঁর নিজের পরিবারের সদস্যরাও সেখানে বসবাস করছেন।
“আমিও আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে আছি,” তিনি বলেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন,
“বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক সহিংসতা নয়। এটি একটি কাঠামোগত, পরিকল্পিত এবং ধারাবাহিক মুছে ফেলার প্রক্রিয়া।”
অমল দত্ত বলেন,
“১৯৮৮ সালে সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করার পর থেকেই এই অবনমনের সূচনা হয়। এরপর থেকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে ঘিরে সহিংসতা, জমি দখল, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, মন্দির ভাঙচুর, ধর্মান্তরে বাধ্য করা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ ক্রমশ স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।”
তিনি বলেন, এই ধারাবাহিক নিপীড়নের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে তাদের ভিটেমাটি, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে।
দীপুর মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পর, ২৯ ডিসেম্বর বাজেন্দ্র বিশ্বাস নামে এক হিন্দু আনসার সদস্য গুলিতে নিহত হন। ২৪ ডিসেম্বর অমৃত মন্ডল নামে আরেক হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
চট্টগ্রামের রাউজানে মিতুন শীল ও তার পরিবারকে ঘরের ভেতর আটকে রেখে আগুন ধরানো হয়। তারা কোনোভাবে দরজা ভেঙে বেরিয়ে বাঁচেন, তবে সব সম্পদ পুড়ে যায়।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মনিন্দ্র কুমার নাথ বলেন, “হিন্দুরা দেশের সর্বত্র আক্রান্ত হচ্ছে। আমরা এই দেশের সন্তান, কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বেঁচে আছি।”
তিনি জানান, ১৯৭০-এর দশকে সংখ্যালঘু ছিল জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ, যা এখন নেমে এসেছে প্রায় ৯ শতাংশে।
শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসেই হিন্দু হত্যার সংখ্যা ৮২ এবং ধর্ষণসহ মোট সহিংসতার সংখ্যা ২,৬৭৩ বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও জানান, নতুন বছরের রাতে খোকন চন্দ্র দাস নামের ৫০ বছর বয়সী এক হিন্দুকে ছুরিকাঘাত করে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরানো হয়। তিনি পরে হাসপাতালে মারা যান।
“আমরা বাংলাদেশেই থাকব, পালিয়ে যাওয়া সমাধান নয়। আমরা ন্যায়বিচার ও সমান অধিকার চাই,” বলেন মনিন্দ্র নাথ।
বাংলাদেশ সরকারকে ABC মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সূত্র: ABC News, Australia (প্রকাশ: ৪ জানুয়ারি)
বাংলা ফিচার: OTN Bangla
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au