ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে গ্রেপ্তার ৪, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে…
মেলবোর্ন, ৫ জানুয়ারি- বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক সহিংসতা দেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে তুলছে। গত ৩১ ডিসেম্বর শরীয়তপুরে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। এক মাসের ব্যবধানে এটি ছিল তৃতীয় এমন হামলা। এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কার্যকরভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারছে না। এর ফলে দেশের চলমান রাজনৈতিক রূপান্তর ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নিহত খোকন চন্দ্র দাসের বয়স ছিল ৫০ বছর। প্রথম আলো পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে কীর্তনখোলা বাজার এলাকার একটি গ্রামীণ সড়কে তাঁর অটোরিকশা থামিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে কুপিয়ে আহত করে, এরপর গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন নেভাতে খোকন চন্দ্র দাস পাশের একটি পুকুরে ঝাঁপ দেন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকায় পাঠান। তবে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
ডিসেম্বর মাসেই আরও দুটি ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক গার্মেন্টস কর্মীকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং তাঁর মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একই দিনে ঢাকায় দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। একটি ভবনের অংশে আগুন দেওয়া হয় এবং কয়েকজন সাংবাদিক ছাদে আটকা পড়েন। কয়েক দিন পর অন্য একটি জেলায় আরেকজন হিন্দু ব্যক্তিকে জনতা পিটিয়ে হত্যা করে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের দাবি, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অন্তত ২ হাজার ৪৪২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে হত্যা, যৌন নির্যাতন এবং উপাসনালয়ে হামলাও রয়েছে। আলাদা হিসেবে প্রথম আলো জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর প্রথম দুই সপ্তাহেই এক হাজারের বেশি সংখ্যালঘু মালিকানাধীন বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়।
আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া বা দেরিতে নেওয়ার কারণে সমাজে যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘নিয়মের ক্ষয়’ বলেন, সেই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অর্থাৎ, আইন কাগজে থাকলেও বাস্তবে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হচ্ছে না। আইন থাকলেও তা প্রয়োগ না হলে সহিংসতা ঠেকানো যায় না এবং শৃঙ্খলাও বজায় থাকে না।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে সরকার পতনের পর আদালত, পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানকে আগের সরকারের অনুগত মনে করা হয়। সেই ধারণা সত্য হোক বা না হোক, আইনের প্রয়োগ থেমে থাকতে পারে না। যদি জনতার হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্র দ্বিধা করে, তাহলে সহিংসতা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যখন লক্ষ্যবস্তু হয় আগের সরকারের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা গোষ্ঠীগুলো।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন পরিস্থিতির উদাহরণ রয়েছে। ২০১১ সালে মিসরে হোসনি মুবারকের পতনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বেড়ে যায়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল। ইরাকে সাদ্দাম হুসেইনের পতনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবৈধ মনে করায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় আইনের ওপর আস্থা ভেঙে গেলে সংগঠিত সহিংসতার পথ খুলে যায়।
বাংলাদেশে এই সহিংসতার প্রধান শিকার হচ্ছেন হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধরা। অতীতে এদের অনেকেই আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছেন, কারণ দলটি নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করত। অন্য দলগুলোর প্রতি তাদের মধ্যে ইসলামপন্থী ঝোঁকের আশঙ্কা ছিল। এই বাস্তবতার কারণেই বর্তমান প্রতিক্রিয়ায় এসব সম্প্রদায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
হামলার ধরন হিসেবে দেখা যাচ্ছে বাড়িঘরে আগুন দেওয়া, পিটিয়ে হত্যা এবং প্রকাশ্যে হুমকি। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সময়মতো পৌঁছায়নি বা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এতে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রকাশ্যে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার মাত্রা ও গুরুত্ব অস্বীকার করে আসছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এসব অভিযোগকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উল্লেখ করেন। এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে সমালোচনা ঠেকাতে কাজে লাগলেও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করে। এতে সংখ্যালঘুরা আরও অনিরাপদ হয়ে পড়ছে।
এ অবস্থার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী আবারও প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দলটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশাসনের কিছু অংশে প্রভাব বাড়াচ্ছে। তাদের নেতাদের বক্তব্যে সংসদে শরিয়াহ আইন চালু করার কথা বলা হচ্ছে এবং মানুষের তৈরি আইনের কর্তৃত্ব অস্বীকার করা হচ্ছে। যদিও এসব ধারণা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধের সঙ্গে মেলে না, তবে রাষ্ট্রের নীরবতা এই প্রবণতাকে উৎসাহ দিচ্ছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের বাইরে থাকা কিছু গোষ্ঠী কার্যত সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার ক্ষমতা পাচ্ছে। রাষ্ট্র তাদের থামাতে না পারলে আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ আস্তে আস্তে এসব গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে, যাদের কোনো গণতান্ত্রিক বৈধতা নেই।
এই বাস্তবতায় সংখ্যালঘুরা আইনে সমান নাগরিক হলেও বাস্তবে তারা বেশি সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকছেন, ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ কম পাচ্ছেন এবং জাতীয় পরিচয়ের বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছেন। বিশেষ করে নির্বাচন বা ধর্মীয় উৎসবের সময় এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর যে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন এসেছিল, সেখানে সবার জন্য সমতা ও মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। জুলাই সনদে আইন সংস্কার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিকত্বের কথা বলা হয়েছিল। কিছু আনুষ্ঠানিক সংস্কার শুরু হলেও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষয়ের লক্ষণ। এই পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টানো না গেলে দেশের রাজনৈতিক রূপান্তর তার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলতে পারে।
সূত্রঃ Religion Unplugged
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au