‘এখনো সময় আছে’, জুলাইপন্থীদের উদ্দেশে মাহফুজ আলম
মেলবোর্ন, ২০ জুন- জুলাই আন্দোলনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, মধ্যবিত্ত সমাজের ভূমিকা এবং রাষ্ট্র রূপান্তরের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তিনি মনে…
মেলবোর্ন, ১১ জানুয়ারি- নির্বাচন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ভিড়ে হঠাৎ করেই দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র-‘মুজিব ভাই’। ৯ জানুয়ারি একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘মুজিব ভাই’ সিনেমা নির্মাণে রাষ্ট্রীয় অর্থ থেকে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি টাকা। এই তথ্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই একে রাষ্ট্রীয় অর্থের নজিরবিহীন লুটপাট হিসেবে আখ্যা দেন, আবার কেউ কেউ তথ্যটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।
এই আলোচিত তথ্যের উৎস হিসেবে গণমাধ্যমগুলো উল্লেখ করে সরকারের প্রকাশিত একটি শ্বেতপত্র। ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতে গত ১৫ বছরে সংঘটিত দুর্নীতি, অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে ৫ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ৩ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার ওই শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধে নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতেই এই দলিল।
তবে বাস্তবে শ্বেতপত্রটি প্রকাশের পরপরই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক ও বিভ্রান্তি। বিশেষ করে ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার কথিত ব্যয় নিয়ে। কারণ অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, শ্বেতপত্রে কোথাও ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার জন্য ৪ হাজার ২১১ কোটি টাকা ব্যয়ের কোনো উল্লেখ নেই।
শ্বেতপত্রের ফ্যাক্ট ১২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে আইসিটি ডিভিশন অনুৎপাদনশীল ও দলীয় কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করেছে এমন অভিযোগ উঠেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সঙ্গে আইসিটি ডিভিশনের একাধিক সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ দলীয় উদ্দেশ্যসম্পন্ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে ‘খোকা’ নামের অ্যানিমেটেড সিরিজ এবং ‘মুজিব ভাই’ শীর্ষক অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্বেতপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আইসিটি ডিভিশনের তহবিল থেকে মোট ৪২১১.২২ লাখ টাকা রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ অঙ্কটি ৪২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা। এই ব্যয় কোনো একক সিনেমার নির্মাণ খরচ নয়, বরং কয়েকটি অডিও-ভিজ্যুয়াল কার্যক্রমের সম্মিলিত ব্যয়।
একই অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ (২০১৭), ‘মুজিব ভাই’ (২০২৩), ‘খোকা’ এবং ‘সমৃদ্ধ আগামীর প্রতিচ্ছবি’ (২০২৩) এসব উদ্যোগ সরাসরি আইসিটি ডিভিশনের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে। শ্বেতপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং ও দলীয় বয়ানকে জোরদার করা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ৪২১১.২২ লাখ টাকার এই হিসাবকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেই ‘৪ হাজার কোটি টাকা’ ব্যয়ের গল্প ছড়িয়ে পড়েছে। গণিতের হিসাবে ৪২১১.২২ লাখ টাকা কোনোভাবেই ৪ হাজার কোটি টাকায় রূপ নিতে পারে না। তবু শ্বেতপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সেই তথ্য প্রকাশিত হওয়ায় বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘মুজিব ভাই’ সিনেমাটির নিজস্ব তথ্য। ২০২৩ সালের ২৩ জুন রাজধানীর একটি সিনেপ্লেক্সে সিনেমাটির প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। তখন জানানো হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অবলম্বনে নির্মিত এই অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছে আইসিটি বিভাগের মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশন দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প। সিনেমাটির পরিচালক ছিলেন চন্দন কুমার বর্মন ও সোহেল মোহাম্মদ।
সেদিনের অনুষ্ঠানে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, দেশের অ্যানিমেশন শিল্পের বিকাশে এই চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শিশু ও তরুণদের বঙ্গবন্ধুর জীবন ও নেতৃত্ব সম্পর্কে জানানোই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ মিনিট। এটি ২৬ জুন সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পায় এবং বর্তমানে ইউটিউব ও বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখা যাচ্ছে। সিনেমাটির অ্যানিমেশন তৈরি করে টেকনোম্যাজিক প্রাইভেট লিমিটেড ও হাইপার ট্যাগ লিমিটেড।
এই প্রসঙ্গে তরুণ নির্মাতা আনন্দ কুটুম বলেন, তিনি যতটুকু জানেন, সিনেমাটির বাজেট ছিল মাত্র চার কোটি টাকার কাছাকাছি। তাঁর ভাষায়, অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের জন্য সেটিও খুব বড় বাজেট নয়। বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশিপও ছিল বলে তিনি শুনেছেন। চার কোটি টাকার একটি প্রকল্প কীভাবে ৪ হাজার কোটি টাকার গল্পে রূপ নিল, সেটিকে তিনি অবিশ্বাস্য বলেই মন্তব্য করেন।
সব মিলিয়ে শ্বেতপত্রের তথ্য ও বাস্তব হিসাব বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ‘মুজিব ভাই’ সিনেমা নিয়ে ছড়ানো ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। ৪২ কোটি টাকার একটি সামষ্টিক ব্যয়ের হিসাব ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল উপস্থাপনার মধ্য দিয়েই দেশজুড়ে আলোচিত এই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সুত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au