বাংলাদেশ

গভীর জ্বালানি সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ

  • 3:50 pm - January 12, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩১৫ বার
গভীর জ্বালানি সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১২ জানুয়ারি- বাংলাদেশ ক্রমেই একটি গভীর জ্বালানি সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সার কারখানা ও শিল্পখাতে গ্যাসের ঘাটতি এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই সংকটের শিকড় বিস্তৃত হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে, যখন স্থানীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ না করে আমদানিনির্ভর নীতির ওপর ভর করে জ্বালানি চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হয়।

সে সময় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে জ্বালানি আমদানি টিকিয়ে রাখতে দফায় দফায় দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু এতে সংকট কাটেনি, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বর্তমানে রাজস্ব আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে জ্বালানি আমদানিতে, আর বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। এরই মধ্যে এলপিজি সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, অথচ সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৫৮ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১২২ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। শুধু তা-ই নয়, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যেখানে গ্রিডে সরবরাহ ছিল ২৭৫ কোটি ঘনফুট, সেখানে এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫৮ কোটিতে।

দেশে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে চারটির উৎপাদন গত এক বছরে কমেছে। স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি বিভাগ অন্তত ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। তবে এখানেও সরবরাহ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন এক বছরে ৫২৩ মিলিয়ন ঘনমিটার কমেছে। বাপেক্সের গ্যাস উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় অর্ধেক আসে মার্কিন কোম্পানি শেভরনের ক্ষেত্রগুলো থেকে, কিন্তু সেখানেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিদেশি আরেকটি কোম্পানি তাল্লোর উৎপাদনও কমতির দিকে।

পেট্রোবাংলা কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় মজুদ কমে যাওয়ার কারণে প্রতিদিন গ্রিড থেকে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন কূপ সংযুক্ত করলেও সামগ্রিক সরবরাহে তার ইতিবাচক প্রভাব খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকার এলএনজি আমদানি বাড়াচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পর থেকে দেশে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আগের সরকার দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো বিদেশি কোম্পানি শেষ পর্যন্ত অংশ নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ বিষয়ে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, যেগুলোর দৈনিক সক্ষমতা ১০০ কোটি ঘনফুট। নতুন করে আরও একটি টার্মিনাল নির্মাণের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি নতুন ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনে অন্তত তিন বছর সময় লাগে। ফলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। অনেক শিল্পকারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বা অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। এতে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে উদ্যোক্তারা অভিযোগ করছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা নতুন বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতিকে বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতীর মতে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে গ্যাস অনুসন্ধানে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়াই আজকের সংকটের মূল কারণ। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ একটি রাজনৈতিক সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার ছাড়া সম্ভব নয়।

ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমামও মনে করেন, গ্যাস খাতে দ্রুত কোনো সমাধান নেই। তার মতে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এলএনজি নির্ভরতা কমানোর একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা প্রয়োজন, নইলে ব্যয়বহুল জ্বালানি দিয়ে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকার স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানিও চালু রাখবে। নতুন রিগ কেনা, গভীর কূপ খনন এবং সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন কর্মকর্তারা। তবে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি।

সব মিলিয়ে জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অবহেলা, আমদানিনির্ভর নীতি এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে বাংলাদেশ এমন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে, যা আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ বণিকবার্তা

এই শাখার আরও খবর

সমাধানের পথ নেই, বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি

মেলবোর্ন, ০৭ মার্চ- ইরানের সাথে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের রেশ সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে পড়েছে বাংলাদেশ তার…

ব্যাংক হিসাবের বাইরে রয়েছে গোপন সম্পদ? প্রশ্নের মুখে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতি,…

ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে সশস্ত্র রোবট, প্রযুক্তিনির্ভর লড়াইয়ে নতুন অধ্যায়

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের যুদ্ধ ধীরে ধীরে এক উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর সংঘাতে রূপ নিয়েছে। আকাশজুড়ে গুপ্তচর ও হামলাকারী ড্রোনের ঝাঁক নিয়মিত উড়তে…

ইরানে এযাবৎকালের ‘বৃহত্তম বোমাবর্ষণ’ হতে পারে আজ রাতেই

মেলবোর্ন,৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে…

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ: বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার অমর দিকনির্দেশনা

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বাঙালি জাতির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ দিনটি এক অনন্য, অবিস্মরণীয় এবং গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই…

ট্রাম্পের যুদ্ধ, বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চল ও বিশ্বের সম্পর্কের মানচিত্র

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au