বাংলাদেশ

সাধারণ শিক্ষার্থীর নামে শিক্ষক হেনস্তাকারীরা শিবির-সম্পৃক্ত

  • 4:33 pm - January 13, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৪৬ বার
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে টেনে–হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন , ছবি: ভিডিও থেকে পাওয়া।

মেলবোর্ন, ১৩ জানুয়ারি- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে এসব ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযোগ উঠেছে, ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ পরিচয়ে যারা এসব ঘটনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের বড় একটি অংশ ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত।

২০২৫ সালের ৪ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতারের কক্ষে ঢুকে তাকে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হয়। ওই সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আপনি নিজ যোগ্যতায় বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি, আপনি আমাদের কথা শুনতে বাধ্য।’ একই দিনে সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তীকে প্রশাসনিক ভবনে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এর আগেও ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক রন্টু দাশকে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে হেনস্তা করা হলে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।

এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি আইন বিভাগের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে ধাওয়া দিয়ে ধরে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাটি ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। শিক্ষকদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে একটি পক্ষ মব তৈরি করে শিক্ষক হেনস্তা করছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ধ্বংস করছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, উপাচার্য ও কুশল বরণ চক্রবর্তীকে হেনস্তার ঘটনায় উপস্থিত ও সক্রিয় ছিলেন চবি শাখা ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ পারভেজ, প্রচার সম্পাদক ও চাকসুর যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক ইসহাক ভূঁইয়া, সাবেক অফিস কার্যক্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুল্লাহ খালেদ, সাবেক কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক সাখাওয়াত শিপনসহ আরও কয়েকজন। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক রন্টু দাশকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাতেও এই একই ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে।

আইন বিভাগের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে হেনস্তার ঘটনায় নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল্লাহ আল নোমান, মাসুম বিল্লাহ, মেহেদী হাসান সোহান ও ফজলে রাব্বি তওহীদ। রাতে তৎপর ছিলেন জান্নাতুল ফেরদাউস রিতা। তারা সবাই এবারের চাকসু নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব পদে দায়িত্বে থাকা নেতারাই সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি কোনো আন্দোলনে অংশ নেননি, কোনো দায়িত্বে ছিলেন না এবং কোনো শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের বোর্ডের সদস্যও ছিলেন না। সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কারও বিরুদ্ধে মামলা করেননি বলেও দাবি করেন।

এ বিষয়ে প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী জানান, সহকারী প্রক্টরের কোনো শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা নেই। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তা হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে যায়। সেখানে সহকারী প্রক্টর সদস্য হতে পারেন না এবং প্রক্টরও সরাসরি মামলার বাদী হতে পারেন না।

বিশিষ্টজনেরা বলছেন, কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ায় তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু মব তৈরি করে শিক্ষককে অবরুদ্ধ করা বা হেনস্তা করা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির পরিপন্থী এবং সমাজে ভয়ংকর দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ই জাতির মেধাবী অংশ। অথচ সরকার পতনের পর চবিতে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা গভীর উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণেই শিক্ষকরা মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে চাকসুর ভিপি ও চবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইব্রাহিম রনি দাবি করেন, যেসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন নষ্ট করেছেন এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আগেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির কাজ তদন্ত করা, আর শিক্ষার্থীদের কাজ শিক্ষার্থীরা করছে।

শিক্ষক হেনস্তার একের পর এক ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ না পাওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন জানান, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে দুজন শিক্ষকের বিষয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তবে শিক্ষক হেনস্তার কোনো অভিযোগ এখনো প্রশাসনের কাছে আসেনি।

এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কে রয়েছেন অনেক শিক্ষক। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে উদ্বেগ জানালেও প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খ. আলী আর রাজী ফেসবুকে শিক্ষক রোমানকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ‘অপহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়ার ঘটনায় চাকসু সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছে, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই তারা এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, কোনো অসহযোগিতার অভিযোগ থাকলে তা লিখিতভাবে জানাতে হবে এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই শাখার আরও খবর

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলারডুবি, মেয়ে নিহত মা নিখোঁজ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  পিরোজপুরে দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারডুবিতে প্রাণ গেছে আট বছরের শিশু অর্পিতা বেপারীর। এ ঘটনায় তার মা রিনা…

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

সিডনি ও পার্থে বিএইচএসএএ’র শারদীয় পূজা পরিক্রমা সম্পন্ন

শতদল তালুকদার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও পার্থে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএইচএসএএ’র (BHSAA) শারদীয় দুর্গাপূজা পরিক্রমা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য…

মহানবমী আজ, কাল প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)। দিনভর নানা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au