সমাধানের পথ নেই, বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি
মেলবোর্ন, ০৭ মার্চ- ইরানের সাথে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের রেশ সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে পড়েছে বাংলাদেশ তার…
মেলবোর্ন,৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আজ রাতেই ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এযাবৎকালের অন্যতম বৃহত্তম বোমাবর্ষণ অভিযান পরিচালিত হতে পারে। এই হামলার লক্ষ্য হবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো।
স্কট বেসেন্ট বলেন, আসন্ন এই সামরিক অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর ওপর সবচেয়ে বড় ধরনের আঘাত হানা হবে। তার ভাষায়, এই হামলার মাধ্যমে এসব স্থাপনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে অকার্যকর করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইরান অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের প্রভাবকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে এমন অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি সিবিএস নিউজের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যুদ্ধের কৌশল সেই অনুযায়ী নির্ধারণ করা হচ্ছে।
পিট হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, কারণ কে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুরোপুরি অবগত আছেন। প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে যাই ঘটুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র তার কঠোর জবাব দেবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিপক্ষকে ক্রমাগত চাপের মধ্যে রাখা এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ইরানের সামরিক শক্তি কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
এর আগে সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে তথ্য দিচ্ছে। যদিও রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বীকারোক্তি দেওয়া হয়নি। তবে ক্রেমলিন জানিয়েছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
ক্রেমলিনের বিবৃতি অনুযায়ী, ওই আলাপে পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় সমবেদনা জানিয়েছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনায় পুতিন আরও জানিয়েছেন যে তিনি পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
এদিকে যুদ্ধের উত্তেজনা কেবল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জর্ডানের আকাবা শহরের আকাশসীমায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার খবর পাওয়া গেছে। আল জাজিরার এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আকাবা শহরের আকাশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে। আকাবা শহরটি দক্ষিণ ইসরায়েলের ইলাত শহরের ঠিক বিপরীত পাশে অবস্থিত। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে নতুন করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব হামলার মোকাবিলায় ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো বর্তমানে পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় রয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ইরানের রাজধানী তেহরানের প্রধান অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর মেহরাবাদের কিছু অংশে আগুন জ্বলছে এবং আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের শেয়ার করা ভিডিওতে বিমানবন্দরের ভেতরে একটি জ্বলন্ত বিমানও দেখা গেছে। এর আগে স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে ওই বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজ অবস্থান করতে দেখা গিয়েছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও বিমানবন্দরের কিছু অংশে হামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে ঠিক কোন কোন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন দফায় ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই এই হামলার ঘটনা ঘটে।
এর আগে গত ৪ মার্চও মেহরাবাদ বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। সে সময় ইসরায়েল দাবি করেছিল, বিমানবন্দরে থাকা প্রতিরক্ষা ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা তাদের বিমান বাহিনীর জন্য হুমকি তৈরি করছিল। সেই কারণেই হামলা চালানো হয়েছিল এবং ওই হামলায় বিমানবন্দরের হেলিকপ্টার তৈরির একটি অংশও ধ্বংস করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
নতুন হামলার বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতের বোমাবর্ষণ আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল এবং বিস্ফোরণের শব্দ অনেক দূর থেকেও শোনা গেছে।
এদিকে সৌদি আরবও তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে হয়েছে বলে জানিয়েছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, একটি তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করে আসা ছয়টি ড্রোন এবং একটি বিমানঘাঁটির দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ড্রোনগুলো সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল মরুভূমি এলাকা এম্পটি কোয়ার্টারে শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়। ওই এলাকায় অবস্থিত শায়বাহ তেলক্ষেত্রই হামলার লক্ষ্য ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সৌদি আরবের জাতীয় তেল কোম্পানি আরামকোর তথ্য অনুযায়ী, শায়বাহ তেলক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করা হয়।
অন্যদিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির দিকে যাচ্ছিল বলে জানা গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী এই ঘাঁটিটি ব্যবহার করেছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক হামলা, পাল্টা হামলা এবং বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পূর্বাভাসে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au