নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৪ জানুয়ারি- নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে এক জনসভায় অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী সুশিলা কার্কি বলেছেন, “আমরা নেপালকে আরেকটি বাংলাদেশ হতে দেব না।” তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটি বাংলাদেশের সমালোচনা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারগুলোর সামনে থাকা একটি বড় শঙ্কার প্রকাশ হিসেবেই বিষয়টি দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
নেপাল বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর গঠিত একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে রয়েছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। জনগণের প্রত্যাশা বাড়ছে, ধৈর্য কমছে, অথচ রাজনৈতিক ঐক্য এখনো দুর্বল। এমন পরিস্থিতিতে কার্কির বক্তব্যে ‘বাংলাদেশের পথ’ বলতে বোঝানো হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর টানা জনচাপ এবং স্বাভাবিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জটিলতা।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, জনআন্দোলনের মাধ্যমে পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও তার জায়গায় একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা দাঁড় করানো অনেক কঠিন। বিশেষ করে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া এসব আন্দোলনের পর বৈধতা, কর্তৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস একের পর এক পরিবর্তনের সাক্ষী। প্রতিবারই সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণ, ডিজিটালি সংযুক্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এতে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এমন চাপ তৈরি হয়েছে, যা সামাল দেওয়ার জন্য সেগুলো আদতে প্রস্তুত ছিল না।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা একটি সতর্কবার্তা হিসেবে উঠে এসেছে। ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভ, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন নির্ধারিত থাকলেও নির্বাচনপূর্ব অস্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এই অনিশ্চয়তাই এড়াতে চায় নেপালের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব।
অন্তর্বর্তী সরকারের চাপ
প্রধানমন্ত্রী কার্কি তাঁর সরকারকে একটি ‘হঠাৎ আসা ঝড়’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই সরকার হঠাৎ দায়িত্ব নিয়েছে এবং একসঙ্গে দেশ স্থিতিশীল করা, জনগণের দাবি সামাল দেওয়া, নির্বাচন আয়োজন এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কঠিন দায়িত্ব পালন করছে, অথচ তাদের কাছে পূর্ণ নির্বাচিত বৈধতা নেই।
নেপালে অন্তর্বর্তী সরকার একদিকে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার মুখে, যারা সরকারকে দুর্বল ও অদক্ষ বলছে, অন্যদিকে আন্দোলনকারী গোষ্ঠীগুলোর চাপ রয়েছে দ্রুত সংস্কার ও বিপ্লবী প্রত্যাশা পূরণের দাবিতে। কার্কি স্বীকার করেছেন, প্রায়ই তাঁর পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে, কিন্তু সমালোচকদের কাছ থেকে বিকল্প কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আসছে না।
এই চিত্র দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় প্রবণতাকেই তুলে ধরে। নির্বাচন, আইন ও সময়সূচিভিত্তিক প্রক্রিয়াকে ছাপিয়ে যাচ্ছে জনতার তাৎক্ষণিক দাবি। গণচাপ গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যদি সংস্কারের বদলে শুধু পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তরুণদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
কার্কির বক্তব্যের আরেকটি সংবেদনশীল দিক হলো তরুণদের ভূমিকা। তিনি বলেন, অনেক সময় ছোট ছোট গোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন, কখনো পরস্পরবিরোধী দাবি নিয়ে সরকারের কাছে আসে। এতে তরুণদের অংশগ্রহণকে খাটো করা হয়নি, বরং সমন্বয়হীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার অভাব নিয়ে হতাশার কথাই উঠে এসেছে।
তরুণদের আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। তারা অন্যায়কে সামনে এনেছে, নৈতিক চাপ তৈরি করেছে। তবে আন্দোলন থেকে শাসনব্যবস্থায় যেতে হলে দরকার সমঝোতা, আলোচনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা বোঝার মানসিকতা।
নেপাল ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, জনগণের বিপ্লবী প্রত্যাশা আর অন্তর্বর্তী সরকারের বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে বড় ফাঁক রয়েছে। একসঙ্গে পুরোনো ব্যবস্থা ভাঙা, নতুন কাঠামো গড়া এবং মানুষের জীবনে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনা প্রায় অসম্ভব। এই বাস্তবতা না বুঝলে ক্ষোভ বাড়ে, বিক্ষোভ চলতেই থাকে, আর সরকার কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
কেন সতর্কতার প্রতীক বাংলাদেশ
বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী মূলত এমন একটি পরিস্থিতির কথা বলেছেন, যেখানে সরকার পরিবর্তনের পরও টানা গণচাপ ও আন্দোলন চলতে থাকে। এতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সুসংহত হয় না, অর্থনীতি স্থবির হয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়।
নেপালের জন্য নির্বাচন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার আগের পরিবেশও ততটাই জরুরি। প্রশাসনিক অস্থিরতা, ঘন ঘন পরিবর্তন আর লাগাতার বিক্ষোভ ভোটের আগেই মানুষের আস্থা ক্ষয় করতে পারে।
কার্কির বক্তব্যে মূল বার্তা হলো, গণতন্ত্র শুধু আন্দোলনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। আদালত, প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতা জরুরি। ভিন্নমত দমন নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তিকে জবাবদিহিমূলক কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসাই প্রয়োজন।
নেপালে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্দোলনকারী গোষ্ঠীগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। সুশিলা কার্কির ‘বাংলাদেশ না হওয়ার’ সতর্কতা আসলে একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আনে। গণঅভ্যুত্থানের উত্তেজনা কমে গেলে রাষ্ট্র কীভাবে স্থিতিশীল পথে হাঁটবে।
নেপালের সামনে এখন বড় সুযোগ। তারা দেখাতে পারে, আন্দোলন আর শাসন একসঙ্গে চলতে পারে, প্রতিবাদকে প্রক্রিয়ায় রূপ দেওয়া সম্ভব। তবে এর জন্য দরকার ক্ষমতাসীনদের সংযম এবং পরিবর্তনকামীদের ধৈর্য।
বিপ্লব দ্রুত হয়, কিন্তু গণতন্ত্র গড়ে ওঠে ধীরে। নেপালের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করবে, দেশটি এই বাস্তবতা কতটা বুঝে এগোতে পারে তার ওপর।
সূত্রঃ নেপাল নিউজ