হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘুদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।
মেলবোর্ন, ১৫ জানুয়ারি: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (HRW) এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের মনসুন বিপ্লবের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে নারী, কিশোরী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ভোটের আগের সময়টিতে নিরাপত্তাহীনতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। নারী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকি আরো অনেকাংশে বেড়েছে । মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা ও সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফৌজিয়া মোসলেম বলেন, এই বৃদ্ধি মূলত কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ার ফল, যারা নারীদের চলাচল ও জনজীবনে অংশগ্রহণ সীমিত করতে চায়।
২০২৫ সালের মে মাসে কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে। তারা এসব কার্যক্রমকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করার দাবি তোলে। এরপর থেকে নারী ও কিশোরীরা মৌখিক, শারীরিক ও ডিজিটাল নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, যার ফলে ভয় ও নীরবতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুরাও সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। গত ডিসেম্বরে ২৭ বছর বয়সী গার্মেন্টস শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একদল লোক পিটিয়ে হত্যা করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অন্তত ৫১টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে ১০টি হত্যাকাণ্ড রয়েছে। চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকায় আদিবাসীরাও বিপ্লবের পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশে অতীতে দুই নারী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও এবং ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে নারীদের বড় ভূমিকা থাকলেও, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনো অত্যন্ত সীমিত। আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। বড় রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী তাদের ২৭৬ জন প্রার্থীর মধ্যে একজন নারীও মনোনয়ন দেয়নি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ সরকারকে নারী ও শিশু বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে, যার মধ্যে সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ এজেন্ডা অনুসরণ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি—যেমন নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) ও নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ (ICCPR)—মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারকে সংবিধান অনুযায়ী ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এগুলো নতুন কোনো দাবি নয়। মনসুন বিপ্লবের আগে ও পরে বাংলাদেশিরা যেসব মূল্যবোধ পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন, এগুলো তারই অংশ। এখন অন্তর্বর্তী সরকার ও সব রাজনৈতিক দলকে লিঙ্গসমতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় স্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে।”
সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
সুভজিত সাহা
সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, নারী অধিকার বিভাগ
HRW