‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ১৬ জানুয়ারি- ইরানের রাজধানী তেহরানের দক্ষিণে একটি ছোট শহরে তখন রাস্তাজুড়ে বিক্ষোভকারীদের ঢল। সেই ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন একজন ইরানীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় নাগরিক, যিনি গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে সিডনি থেকে নিজের জন্মশহরে ফিরেছিলেন।
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি। সেদিন ইরানের কর্তৃত্ববাদী ধর্মতান্ত্রিক সরকার দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম পরিবর্তন করে যিনি নিজেকে ‘আলি’ পরিচয় দিচ্ছেন, তিনি তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেন এবং স্লোগান দিতে থাকেন, ‘স্বৈরাচারের পতন চাই’।
আলি বলেন, শুরুতে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল বিক্ষোভকারীদের অপ্রত্যাশিত বিশাল সংখ্যা এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ। তুরস্ক থেকে এবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সব বয়স ও শ্রেণির মানুষকে সেখানে দেখা গেছে। পরিবার, ছোট শিশুদের নিয়ে আসা মায়েরা, ৭০ বা ৮০ বছরের বৃদ্ধ মানুষ এমনকি চাদর পরা ধর্মপ্রাণ নারীরাও যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ইরানের যুবরাজ রেজা পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিলেন। এক মাস আগেও এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন ছিল বলে জানান তিনি।
তবে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই আলি বুঝতে পারেন, দেশটি নতুন এক রক্তক্ষয়ী অস্থিরতায় ঢুকে পড়েছে। তাঁর ভাষায়, প্রচুর টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয় এবং বিক্ষোভের সামনের সারিতে না থেকেও তাঁদের পাশেই দুজনকে গুলি করা হয়। তখনই তাঁরা বুঝতে পারেন, এবারের দমন অভিযান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন এবং জীবনহানির আশঙ্কা প্রকট।
প্রায় আধা ঘণ্টা রাস্তায় থাকার পর টিয়ার গ্যাসের জ্বালায় তাঁরা বাড়ি ফিরে চোখ ধুয়ে নেন। কিন্তু সেদিন রাতেই আবার রাস্তায় নামেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আলি প্রত্যক্ষ করেন, সরকারপন্থী বাহিনী নিজেদের জনগণের ওপর গুলি চালাচ্ছে ও মারধর করছে।
ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ ইরানে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয় তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে। দ্রুতই সেই আন্দোলন দেশটির ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে রূপ নেয় এবং সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, দেশজুড়ে ৩১টি প্রদেশের ১৮৭টি শহরে অন্তত ৬১৮টি বিক্ষোভ সমাবেশের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, ৮ ও ৯ জানুয়ারি ছিল দেশজুড়ে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের দিন, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী দমন অভিযানে রূপ নেয়। এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এতে ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০টি মৃত্যুর ঘটনা এখনও তদন্তাধীন। তবে লন্ডনভিত্তিক বিরোধী গণমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের দাবি, নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
আলি বলেন, রাস্তায় রক্তের ছাপ ছিল সর্বত্র। বিক্ষোভকারীদের হাতে কিছুই ছিল না, অথচ অপর পক্ষের কাছে ছিল সামরিক মানের নানা অস্ত্র। তিনি জানান, তেহরানের নাজি আবাদ এলাকা ও ইসফাহানের কাছের শহর শাহরেজায় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তাঁর দুই বন্ধু এই দুই দিনের সহিংসতায় নিহত হয়েছেন।
এবিসির হাতে আসা একটি ভিডিওতে, যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, দেখা যায় সরকারপন্থী কর্মকর্তারা গুলিবিদ্ধ বিক্ষোভকারীদের ভিডিও করতে করতে হাসছেন। ভিডিওটি সম্ভবত ১০ জানুয়ারির পর ধারণ করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৬ বছর বয়সী কিশোরসহ বহু নিহতের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। সীমিত ইন্টারনেট সংযোগের সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরিবার ও স্থানীয় সংগঠকেরা এসব তথ্য বাইরে পাঠাচ্ছেন। কিছু বিশ্লেষকের দাবি, তেহরানের একটি মর্গের বাইরে শত শত মরদেহ স্তূপ করে রাখার দৃশ্য ইচ্ছাকৃতভাবে দেখানো হয়েছে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে। আলির মতে, এর লক্ষ্য ছিল অভিভাবকদের সন্তানদের রাস্তায় নামা থেকে বিরত রাখা।
সরকার একাধিক সামরিক জানাজার আয়োজন করেছে এবং দাবি করেছে, বিক্ষোভকারীরা সশস্ত্র সন্ত্রাসী। তবে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখানো হয়নি। আলি জানান, এক পারিবারিক বন্ধু দমন অভিযানে দুই সন্তান হারানোর পর মরদেহ ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য হয়ে কাগজে সই করেন যে তাঁরা সরকারের মিলিশিয়া বাহিনী বাসিজের সদস্য ছিলেন। নইলে মরদেহ নিতে ১০ হাজার ডলার দিতে হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দুজন ব্যক্তি এবিসিকে জানিয়েছেন, তাঁরা রাস্তায় সরকারপন্থী বাহিনীর সদস্যদের আরবি ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, আফগানিস্তান বা ইরাক থেকে আনা সরকারঘনিষ্ঠ প্রক্সি মিলিশিয়ারা দমন অভিযানে যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানিয়েছে, ইরানসমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারা সীমান্ত ব্যবহার করে অস্ত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী আনা নেওয়া করে থাকে এবং তারা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকায় আরও সহিংস হতে পারে।
এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, দমন অভিযানে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের বিষয়ে ভাবছেন বলে জানা গেছে। ইরানের ভেতর থেকে এবিসিকে কথা বলা এক তরুণ বিক্ষোভকারী বলেন, তাঁরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অপেক্ষায়। আলিও একই মত প্রকাশ করে বলেন, ইরানিরা এই লড়াইকে অসম ও অন্যায্য মনে করছেন।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং ইরানে অবস্থানরত অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের দ্রুত দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ইরানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির এবং যেকোনো সময় আরও খারাপ হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ইরানে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার অস্ট্রেলীয় নাগরিক অবস্থান করছেন।
আলি জানান, ৯ জানুয়ারি তিনি তেহরানে গিয়ে এক বন্ধুর স্টারলিংক সংযোগ ব্যবহার করতে সক্ষম হন। দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দুই দিন চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত ইস্তাম্বুলগামী একটি ফ্লাইটে আসন পান। তিনি বলেন, বিমানবন্দরজুড়ে দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের ভিড় ছিল, সবাই দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছিল।
সব মিলিয়ে ইরানের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়ছে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au