চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ১৯ জানুয়ারি- ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন সেই পথ থেকে বড় ধরনের মোড় নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর দেশটি শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়নি, বরং এর আদর্শিক ও কৌশলগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
৮ আগস্ট অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। একই সঙ্গে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক পরিসর আবারও প্রসারিত হয়, আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল করা হয় এবং দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকা তারেক রহমান যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে বিএনপির নেতৃত্বে সক্রিয় হন। এসব পরিবর্তন ভারতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রশ্ন উঠছে, এই অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কি ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার এসে পাল্টাতে পারবে, নাকি বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তার দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ ও ভারতঘেঁষা অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ ও খোলা সীমান্ত, ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা দুই দেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির মধ্যেই বাংলাদেশের জন্মের বীজ নিহিত ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাষা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বৈষম্য ক্রমে অসহনীয় হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয় সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় ১৯৭১ সালে ভয়াবহ দমন–পীড়ন শুরু হয়। এর ফলেই ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর সামরিক শাসনের মাধ্যমে এই ভিত্তি ভেঙে দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমান ও পরে এরশাদের শাসনামলে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হয়, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আবার বৈধতা পায়।
এই সময়েই বিএনপির উত্থান ঘটে এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো দল রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক ইসলাম ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ১৯৯০–এর পর গণতন্ত্র ফিরলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্ব রাজনীতিকে তীব্রভাবে বিভক্ত করে তোলে।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। সন্ত্রাস দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও বাণিজ্যে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ে। তবে একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক পরিসর নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, বিরোধী দলের দমন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে।
২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, তার ওপর কঠোর দমন–পীড়ন, ইন্টারনেট বন্ধ এবং প্রাণহানির ঘটনায় সরকার ব্যাপক জনসমর্থন হারায়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকের কিছু সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক পুনর্বাসন, পররাষ্ট্রনীতিতে ‘ভারসাম্য’ আনার কথা বলা এবং চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত ভারতের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঝোঁক ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার এলেও পুরোপুরি পাল্টানো কঠিন হতে পারে।
২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিক নির্ধারণ করবে। আওয়ামী লীগ নিবন্ধন হারানোয় নির্বাচনের বাইরে থাকলে এবং জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের জয়ের সম্ভাবনা বাড়ছে। এতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হতে পারে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে।
ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় কিভাবে কৌশল ঠিক করা যায়। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন সহযোগিতা, যোগাযোগ প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখা ভারতের জন্য জরুরি। একই সঙ্গে অতীতের ১৯৭১–এর আবেগের ওপর নির্ভর না করে বর্তমান প্রজন্মের বাংলাদেশিদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝাও প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতির বদলে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংযত কূটনৈতিক অবস্থানই ভারতের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
বাংলাদেশ ভারতের পূর্ব সীমান্তে অবিচ্ছেদ্য প্রতিবেশী। এই পরিবর্তনের সময় সম্পর্ক সামলানোই প্রমাণ করবে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত পরিপক্বতা কতটা।
সূত্রঃ ইউরো এশিয়ান টাইমস
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au