বনশ্রীতে স্কুলছাত্রী হত্যা মামলার আসামি মিলন মল্লিক মুসলিম, হিন্দু নন: রিউমর স্ক্যানার। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ জানুয়ারি- ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীতে এক স্কুলপড়ুয়া কিশোরীকে গলাকেটে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া মিলন মল্লিক আদালতে দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযুক্ত মিলনকে হিন্দু বলে প্রচার করা হলেও সেই দাবি সঠিক নয় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেক প্ল্যাটফর্ম রিউমর স্ক্যানার। সংস্থাটির যাচাই অনুযায়ী, অভিযুক্ত মিলন মল্লিক ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু নন, তিনি মুসলিম।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক মঙ্গলবার মিলন মল্লিককে আদালতে হাজির করেন। এ সময় তিনি জানান, আসামি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন মিলনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন পুলিশের উপপরিদর্শক মো. মারুফুজ্জামান।
২৮ বছর বয়সী মিলন মল্লিক নিহত কিশোরীর বাবার খাবার হোটেলের কর্মচারী ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি পলাতক ছিলেন। পরে রোববার রাতে র্যাব বাগেরহাট সদর থানার বড় সিংগা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। শনিবার বিকেলে দক্ষিণ বনশ্রীর এল ব্লকের প্রীতম ভিলা নামের একটি বাসা থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত কিশোরীর বয়স ১৭ বছর। তিনি রেডিয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
ঘটনার সময় কিশোরীর বাবা, মা ও ভাই পারিবারিক কাজে গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জে অবস্থান করছিলেন। বড় বোন শোভা আক্তার দুপুরে ব্যায়ামের জন্য জিমে যান। পরে বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে বাসায় ফিরে এসে তিনি রান্নাঘরের মেঝেতে ছোট বোনের গলাকাটা মরদেহ দেখতে পান। এরপর চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসে এবং পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় শনিবার রাতেই খিলগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা করেন নিহতের বাবা মো. সজিব। মামলায় অজ্ঞাতনামা এক বা একাধিক ব্যক্তির জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হলেও নির্দিষ্ট কোনো নাম ছিল না। তবে নিহতের পরিবারের সন্দেহ ছিল, তাদের হোটেলের কর্মচারী মিলন মল্লিক এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন। কারণ সিসিটিভি ফুটেজে লাশ উদ্ধারের আগে মিলনকে বাসায় ঢুকতে দেখা যায়। মামলার পর র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে এবং রোববার মামলার এজাহার আদালতে দাখিল করা হয়। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজু আহমেদ এজাহার গ্রহণ করে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহতের বাবা মো. সজিব বাসার সামনে শাহজালাল হোটেল নামে একটি খাবারের হোটেল পরিচালনা করতেন। তিনি ছেলে শাকিল ও কর্মচারীদের মাধ্যমে ব্যবসা চালাতেন। গত ৭ জানুয়ারি জমি সংক্রান্ত কাজে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে হবিগঞ্জে যান তিনি। বাসায় তখন দুই মেয়ে ছিলেন। ঘটনার দিন দুপুর দেড়টার দিকে বড় মেয়ে শোভা জিমে গেলে বাসায় একা ছিলেন নিহত কিশোরী।
গ্রেপ্তারের পর র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিলন হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, হোটেল কর্মচারী হিসেবে বিভিন্ন সময় মিলনের ওই বাসায় যাতায়াত ছিল। কিছুদিন ধরে মিলন কিশোরীকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। ঘটনার আগের রাতে কিশোরীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয় এবং গালিগালাজে ক্ষিপ্ত হয়ে পরদিন প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুপুর ১টা ৩৬ মিনিটে মিলন প্রথমবার বাসায় প্রবেশ করেন এবং ১টা ৪১ মিনিটে বড় বোন শোভার সঙ্গে বেরিয়ে যান। শোভা জিমে থাকার সময় আবার ২টা ২৫ মিনিটে মিলন বাসায় ঢোকেন এবং পৌনে ৩টার দিকে বেরিয়ে যান। সে সময় তিনি সঙ্গে করে নাইলনের দড়ি নিয়ে যান এবং পুনরায় কিশোরীকে অনৈতিক প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তিনি দড়ি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে ধরেন। কিশোরী চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন জড়ো হওয়ার আশঙ্কায় রান্নাঘরের বটি দিয়ে তাকে গলাকেটে হত্যা করেন।
র্যাব কর্মকর্তা আরও জানান, হত্যার পর মিলন বাসার আসবাবপত্র তল্লাশি করে কিছু নগদ অর্থ নিয়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন হাতে এলে হত্যাকাণ্ডের সব দিক আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।