চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ২০ জানুয়ারি- বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এখন তাকিয়ে আছে একটি নির্বাচিত সরকারের দিকে। তাদের কাছে নির্বাচিত সরকারের মূল আকর্ষণ বৈধতা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও সংসদই মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, তাদের কষ্ট ও সংগ্রাম বুঝতে পারে এবং কর্মসংস্থান, আস্থা ও নতুন সম্ভাবনা তৈরির মতো নীতি গ্রহণ করতে পারে বলে বিশ্বাস করছেন তারা।
দেশজুড়ে একটি ধারণা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জায়গায় দ্রুত একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন। অনেক নাগরিকের কাছে এই প্রত্যাশা অযৌক্তিক নয়। কারণ অতীতে অনির্বাচিত প্রশাসনের অধীনে বারবার হতাশ হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।
তবে এই আশাবাদের আড়ালেই বাড়ছে অস্বস্তি। সমালোচকদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করতে চাইলেও এর মধ্যে রয়েছে কাঠামোগত অদক্ষতা এবং তৃণমূল রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নতা। এই বিচ্ছিন্নতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার কখনোই দীর্ঘমেয়াদি শাসনের জন্য ছিল না। সাধারণত এসব সরকার নির্বাচিত সরকারের মধ্যবর্তী সময় পার করার জন্য, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল।
এই অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের চাওয়া এখন বড় কোনো বক্তব্য নয়, বরং দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসা, কার্যকর শাসনব্যবস্থা এবং একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকার।
কেন নির্বাচিত সরকারের দিকেই তাকিয়ে সবাই
অল্পসংখ্যক মানুষই বিশ্বাস করেন যে অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারবে। এর মূল কারণ হচ্ছে জনগণের সরাসরি সমর্থনের অভাব। নির্বাচিত সরকারের মতো এই প্রশাসনের কোনো গণভিত্তি নেই। ফলে বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগও অনেকের কাছে অস্থায়ী ও অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় অনির্বাচিত সরকারের অধীনে থাকলে সংকট কমার বদলে আরও গভীর হতে পারে।
ব্যবসায়ীরা এই অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে, নতুন উদ্যোগ স্থগিত করে এবং ঋণের প্রবাহ ব্যাহত করে। বর্তমান সময়ে অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করছেন, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বাস্তব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের যোগাযোগ কমে গেছে।
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। তাদের মতে, নির্বাচিত সরকারই পারে মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে, জীবনযাত্রার বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝতে এবং নতুন করে আশার আলো জ্বালাতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা
অনেকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভুল হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, এই সরকার অদক্ষতা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ঘাটতিতে ভুগছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও টেকনোক্র্যাটদের নেতৃত্বে প্রশাসন ধীরগতির হয়ে পড়েছে।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব। রাজনৈতিক ভিত্তি ও নির্বাচনী জবাবদিহি না থাকায় উপদেষ্টারা অনেক সময় স্থানীয় চাহিদা বুঝতে বা অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এতে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও এই সরকার একটি বিভক্ত ও নাজুক সমাজের জটিলতা সামাল দিতে সক্ষম নয়।
সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব রাজনৈতিক সংলাপের বদলে বেশি ঝুঁকছে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দিকে। এর ফলে জনআস্থা কমছে এবং ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের আগ্রহও হ্রাস পাচ্ছে।
সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টাদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও আন্তরিক বলে পরিচিত। কিন্তু শুধু আন্তরিকতা দিয়েই অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক আস্থাহীনতা এবং জাতীয় পরিচয়ের মতো গভীর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ছাড়া এই সংকট কাটানো কঠিন।
সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকা অধৈর্যতা এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তারা আশা করছে, একটি নির্বাচিত সরকার ফিরে এলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে বৈধতা পাবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং নীতিনির্ধারকরা আবার সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হবেন।
অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হওয়ার মূল্য
দীর্ঘ সময় অন্তর্বর্তী শাসন চলতে থাকলে নির্বাচনের গুরুত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়। প্রতিটি বিলম্ব এই বার্তা দেয় যে, জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনের চেয়ে ক্ষমতার ধারাবাহিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই সময়েই অর্থনৈতিক সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আঘাত হানছে। কর্মসংস্থান কমছে, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে, রপ্তানি স্থবির হচ্ছে। অনিশ্চিত শাসনের প্রতিটি মাস মানুষের হতাশা বাড়িয়ে তুলছে।
নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজন এখন সবচেয়ে বেশি
বাংলাদেশের এখন কেবল প্রশাসনিক দেখভাল নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক বৈধতা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারই পারে বিভাজন কমাতে, ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং রাষ্ট্রকে আবার মানুষের সঙ্গে যুক্ত করতে।
এই কারণেই দ্রুত একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার গঠনের যে প্রত্যাশা দেখা যাচ্ছে, তা নিছক আবেগ নয়। এটি একটি যৌক্তিক দাবি। বৈধতা, আস্থা এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষাই এখন বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার মূল ভিত্তি। প্রশ্ন শুধু কে শাসন করবে তা নয়, প্রশ্ন হলো কীভাবে শাসন হবে।
লেখকঃ মোঃ শফিউল আলম, সাংবাদিক, দ্য বিজনেস স্টান্ডার্ড
মূল প্রতিবেদন- দ্য বিজনেস স্টান্ডার্ড; অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ ওটিএন বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au