অ্যাডিলেডে বিমান বিধ্বস্তে দুইজন নিহত, হ্যাঙ্গারে ভয়াবহ আগুন
মেলবোর্ন, ২৯ এপ্রিল- অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড শহরের উত্তরে অবস্থিত প্যারাফিল্ড বিমানবন্দর-এ একটি হালকা বিমান বিধ্বস্ত হয়ে দুইজন নিহত এবং মাটিতে থাকা একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। স্থানীয়…
মেলবোর্ন, ২১ জানুয়ারি- ধামরাইয়ে হিন্দু যুবকদের বিরুদ্ধে দলবদ্ধ ধর্ষণের যে অভিযোগ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সরেজমিনে অনুসন্ধানে তার কোনও সত্যতা পায়নি দ্য ডিসেন্ট। স্থানীয় লোকজন, ঘটনাকথিত ভুক্তভোগী, জনপ্রতিনিধি এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র ভিন্ন বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি।
গত মঙ্গলবার দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে শিরোনাম দেওয়া হয়, ধামরাইয়ে স্বামীকে খুঁটিতে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ হিন্দু যুবকদের। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ঢাকার ধামরাইয়ে বেড়াতে এসে এক মুসলিম গৃহবধূ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বামীকে ঘরের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে ওই নারীকে রাতভর পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয় এবং তার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয় উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত রামরাবন গ্রাম।
এই প্রতিবেদনের আগেই ১৭ জানুয়ারি দৈনিক যুগান্তর এবং ১৮ জানুয়ারি দৈনিক দেশ রূপান্তর প্রায় একই ভাষায় একই ঘটনার খবর প্রকাশ করে। তিনটি পত্রিকার প্রতিবেদনের ভাষা ও বর্ণনা প্রায় অভিন্ন ছিল। তবে কোনও প্রতিবেদনেই ভুক্তভোগী নারী বা তার স্বামীর বক্তব্য সরাসরি উদ্ধৃত করা হয়নি। সব ক্ষেত্রেই নামহীন স্থানীয় বা সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে তথ্য দেওয়া হয়।
খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা ও উত্তেজনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে হিন্দু যুবকদের দ্বারা মুসলিম নারী ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই তিনটি পত্রিকা ছাড়া অন্য কোনও বড় গণমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে তেমন কোনও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে দ্য ডিসেন্ট নামের একটি অনুসন্ধানী গণমাধ্যম সরেজমিনে গিয়ে ঘটনাটি খতিয়ে দেখে। সেখানে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, ঘটনাকথিত ভুক্তভোগী, জনপ্রতিনিধি এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য উঠে আসে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে প্রথম যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো ধর্ষণের কোনও ঘটনার কথা কেউ জানেন না। যাকে ভুক্তভোগী নারীর স্বামী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে, সেই আব্দুর রাজ্জাক নিজেই বলেছেন, তার স্ত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে তিনি জানেন না এবং তিনি এমন কোনও অভিযোগ কাউকে করেননি।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ঘটনার সময় দুজন হামলাকারী ঘরে ঢুকে তাকে মারধর করে এবং তার মানিব্যাগ, মোবাইল ফোনসহ কিছু জিনিস নিয়ে যায়। এরপর তার স্ত্রীকে বাইরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর হামলাকারীরা চলে গেলে তিনি বাইরে গিয়ে কিছু দূরে তার স্ত্রীকে কান্নারত অবস্থায় পান। তখন তার স্ত্রী জানান, তার ব্যাগ, টাকা ও কিছু অলংকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে শারীরিকভাবে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে এমন কোনও কথা তার স্ত্রী বলেননি।
ঘটনার পরপরই প্রতিবেশীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও কেউ ধর্ষণের কোনও আলামত দেখেননি। স্থানীয়দের কেউই স্বামীকে খুঁটিতে বেঁধে মারধরের বিষয়টি দেখেননি বা শোনেননি। আব্দুর রাজ্জাক নিজেও জানিয়েছেন, তাকে খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়নি।
আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন, ঘটনার পর তিনি কোনও সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেননি। অথচ যে তিনটি পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে তার বা তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া নারীর কোনও বক্তব্য নেই। সব তথ্যই এসেছে নামহীন সূত্র থেকে। এই ঘটনায় থানায়ও কোনও লিখিত অভিযোগ করা হয়নি।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছিনতাইকারীদের পরিচয় সম্পর্কে কেউই কিছু জানে না। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, হামলাকারীরা মুখ ঢাকা অবস্থায় ছিল এবং রাতের অন্ধকারে ঘরের আলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে তিনি কাউকে চিনতে পারেননি। স্থানীয়রাও জানিয়েছেন, তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা চলে যায়। তাই তারা হিন্দু না মুসলিম, কিংবা কারা ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার কোনও সুযোগই হয়নি।
ঘটনাস্থলটি ধামরাই উপজেলার রামরাবন এলাকায় একটি এক কক্ষবিশিষ্ট টিনের ঘর। ওই ঘরের মালিক শান্তি মনি দাস। ঘটনার রাতে আব্দুর রাজ্জাক ও তার সঙ্গে থাকা নারীকে মেহমান হিসেবে ওই ঘরে থাকতে দেওয়া হয়। শান্তি মনি দাস নিজে মেয়েকে নিয়ে ভাইয়ের বাড়িতে চলে যান। ঘটনার পরদিন তিনি বিষয়টি জানতে পারেন।
প্রতিবেশী শিল্পী মনি দাস বলেন, রাত আনুমানিক একটার দিকে মারধরের শব্দ শুনে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন ওই দম্পতি ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন। ওই নারী জানান, তার গহনা, টাকা ও মোবাইল ফোন নেওয়া হয়েছে। তবে ধর্ষণের কোনও কথা তখন তিনি বলেননি।
আরেক প্রতিবেশী বিকাশ চন্দ্র মনি দাস বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি ওই নারীকে কান্নাকাটি করতে দেখেছেন। তিনি জানান, ওই নারী তার টাকা ও অলংকার ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। কাউকে বেঁধে রাখা বা ধর্ষণের কোনও আলামত তিনি দেখেননি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মন্টু চন্দ্র মনি দাস জানান, তিনি পরদিন সকালে লুটপাটের ঘটনার কথা জানতে পারেন। তবে কেউ তার কাছে বিচার বা সহযোগিতা চাননি। যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন, তারাও শুধু লুটপাটের কথাই বলেছেন।
আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে দশটার দিকে এক ব্যক্তি দরজায় নক করে তাদের পরিচয় জানতে চায়। পরে রাত দেড়টার দিকে চার থেকে পাঁচজন এসে দরজা খুলতে বাধ্য করে। তারা তাকে মারধর করে এবং তার ও তার সঙ্গের নারীর কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ফোন ও অলংকার ছিনিয়ে নেয়। পাঁচ মিনিটের মতো সময়ের মধ্যেই তারা চলে যায়। ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের কোনও ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।
এদিকে অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আব্দুর রাজ্জাকের প্রকৃত স্ত্রী মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার বাসিন্দা। তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনার দিন তিনি ধামরাইয়ে যাননি এবং ওই নারী তিনি নন। তিনি আরও জানান, ওই দিন তার স্বামী তার সঙ্গে ছিলেন না এবং তিনি বালিয়াটি রাজবাড়ি ভ্রমণের বিষয়েও কিছু জানতেন না।
পুলিশও সরেজমিন তদন্তে ধর্ষণের অভিযোগের কোনও সত্যতা পায়নি। ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা খান বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, সেখানে কোনও ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। কেউ আইনি অভিযোগ করলে তা খতিয়ে দেখা হবে, তবে এখন পর্যন্ত ধর্ষণের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধান, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে, ধামরাইয়ের রামরাবন এলাকায় একটি ছিনতাই ও মারধরের ঘটনা ঘটলেও হিন্দু যুবকদের দ্বারা দলবদ্ধ ধর্ষণের যে অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল পাওয়া যায়নি।
সূত্রঃ দ্য ডিসেন্ট
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au